ঠাকুরগাঁওয়ে ঈদ কে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কামাররা

 ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি:

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও জেলায় জমতে শুরু করেছে কোরবানির পশু কাটার জন্য দরকারি উপকরণ। তাই দা, ছুরি-চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত কামাররা। ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার মাদারগঞ্জ বাজার থেকে তোলা কৃষ্ণ সরকার,দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। আর এই ঈদের অন্যতম কাজ হচ্ছে পশু কোরবানি করা। ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশু জবাইয়ের সরঞ্জাম প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার মাদারগঞ্জ কামার পট্টিগুলো।

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম হচ্ছে ঈদুল আজহা। আর এই ঈদে মুসলিম ধর্মের অনুসারীরা আল্লাহকে রাজি খুশি করতে পশু জবাই করে থাকে। ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মুসলমানদের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তার ছেলে ইসমাঈল (আ.) কে কোরবানি করে ছিলেন সৃষ্টিকর্তাকে রাজি খুশি করতে। পরে আল্লাহ তায়ালা তার কোরবানি কে পছন্দ করে ছেলের স্থলে ফেরেশতাকে হুকুম দেয় পশু রেখে দিতে।

এখান থেকেই মুসলমানরা প্রতি বছর আল্লাহকে রাজি খুশি করতে ঈদুল আজহার নামাজের পর পশু জবাই করে। আর এই পশু জবাইয়ের জন্য প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামাদি। মাংস কাটা এবং কোরবানির পশু জবাই করার বিভিন্ন ধাপে ছুরি, দা, চাপাতি এসব ব্যবহার করা হয়। ঈদের বাকি আর ৭ দিন। তাই পশু কোরবানি কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁও জেলার কামারপল্লীগুলো অনেকটাই ব্যস্ত সময় পার করছে। দগদগে আগুনে গরম লোহায় ওস্তাদ-সাগরেদের পিটাপিটিতে মুখর হয়ে উঠেছে কামারশালাগুলো। আবার এসব ধাতব সরঞ্জামাদি শান দিতে শানের দোকানগুলোতেও ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। ভ্রাম্যমাণ শানদানিদেরও অনেক ভালো সময় কাটে এই মৌসুমে।

গতকাল ঠাকুরগাঁও কালিবাড়ি,শিবগঞ্জ, মাদারগঞ্জ , লাহিড়ী হাট সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়। ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি মাদারগঞ্জ বাজারের কামারশালাগুলোর ব্যস্ততা এখন সবচেয়ে বেশি। ভুল্লী কর্মকাররাও ব্যস্ত সময় পার করছেন জবাই সামগ্রী প্রস্তুতে। ঈদে হাজার হাজার গরু, খাসি, ভেড়া, মহিষ, উট, দুম্বা ইত্যাদি পশু কুরবানি করা হয়ে থাকে। এসব পশু জবাই থেকে শুরু করে রান্নার চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যন্ত দা-বঁটি, ছুরি-ছোরা, চাপাতি ইত্যাদি ধাতব হাতিয়ার আবশ্যকীয় হয়ে যায়।

ঈদের আগেই পশু জবাই করার ছুরি, চামড়া ছাড়ানোর ছুরি, চাপাতি, প্লাস্টিক ম্যাট, চাটাই, গাছের গুঁড়িসহ সবকিছু প্রস্তুত রাখতে হয়। গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন দামে ছুরি, বঁটি, চাপাতি বিক্রি হচ্ছে দোকানগুলোতে। বড় ছুরির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ছুরির দাম ২৫০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত। বড় ছুরিগুলো ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছে দোকানিরা। দেশি চাপাতিগুলো কেজি হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতি কেজি ওজনের চাপাতির দাম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এছাড়া বিদেশি চাপাতির দাম ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। বঁটি প্রতিটির দাম ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। হাড় কাটার ছোট চাইনিজ কুড়াল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। ঠাকুরগাঁও জেলায় সবচেয়ে বড় কামার পট্টি মাদারগঞ্জ বাজার। সেখানে কর্মচারী-মালিকরা মিলে পুরোদমে তৈরি করছে কুরবানির সরঞ্জামাদি। কথা হয় এক দোকানে বসে থাকা সজিবের সাথে। তিনি জানান, সারাবছর বেচাকেনা টুকটাক থাকে। কোনোরকম দিন যায়।

এই সময়ের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকি। কোরবানির ঈদের আগে এক সপ্তাহ ভালো বেচাকেনা হয়। ওই সময় দামও ভালো পাওয়া যায়। বৃহসপ্রতিবার মাদারগঞ্জ বাজার কামার পট্টির সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। তবে ঈদের আগে এদিনও দোকান খোলা রাখেন কেউ কেউ। এছাড়া সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে মার্কেট সকাল ৭টা বিকাল ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। হারুন মিয়ার দোকানে কাঁচা লোহার তৈরি ছোট ছুরি (গরুর চামড়া ছাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত) ৬০ এবং পাকা লোহার তৈরি ছুরি ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জবাই ছুরি মিলছে ৫০০-৬০০ টাকায়। বিভিন্ন সাইজের চাপাতি ৬০০-৮০০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। দা-বঁটি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০০ টাকায়। দোকানি আব্দুল জব্বার জানান, ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম ব্যস্ত কামারপট্টি এটি। এখান থেকেই সারা শহরে মোটামুটিভাবে সব কামার সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। পাইকারি-খুচরা দুই ভাবেই চলে বেচাকেনা। ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখনো পুরোদমে বিক্রি শুরু হয়নি।

ঈদের গরুর বাজার এখনো ভালোভাবে শুরু না হওয়াকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। আগে মানুষ গরু কিনবে পরে ছুরি-চাপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কিনবে। তবে কবে থেকে পুরোদমে বেচা কেনা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, ঈদের চার-পাঁচদিন পূর্ব থেকে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হবে। এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ কামার মনোজ রায় বলেন, এখন আমরা তৈরি করে রাখতেছি। বেচাকেনা শুরু হয়নি। আশা করতেছি আগামী সপ্তাহে পুরোদমে বেচাকেনা হবে। এ ব্যবসায়ী অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বেচাকেনা ভালো হবে বলে আশা করেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন এটা নির্বাচনের বছর। সুতরাং মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বেশি করে কোরবানি করবেন। সে কারণে তাদের বেচাকেনাও ভালো হবে বলে পুরো আশাবাদী। অন্যদিকে ঈদ সামনে রেখে ক্রেতারাও দর দাম করছে।

দেখছে কেমন ছুরি বা চাপাতি নেবে। অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর বিবেচনা করে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সকলেই আসছে মার্কেটে। দেখছে ভালো লোহার জিনিস ও কম দামি লোহার জিনিস। ওয়ারী থেকে চাপাতি ও ছুরি কিনতে বনগ্রাম আ. মতিন কামারের দোকানে আসেন সুজন মিয়া, পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। জবাই করার ছুরি হাতাচ্ছে এবং দর দাম করছে। দোকানি একটি বড় ছুরির দাম চেয়েছে দুই হাজার টাকা। সুজন মিয়া দাম শুনে চিৎকার করে বললেন, ঐ মিয়া এত দাম চান কেন? জবাবে দোকানি বলেন, আমি চাইছি তাইকি আপনি দিয়ে দিছেন? আপনি কত দিবেন বলেন? পরে দর দাম করে ১২শ টাকায় ওই ছুরি ক্রয় করে এবং এক হাজার টাকায় একটি চাপাতি কিনেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, পরে কিনলে দাম আরও বেড়ে যাবে তাই আগেই কিনে নিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *