অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা : উপসর্গ, কারণ ও চিকিৎসা

বিজ্ঞান ও টেক

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা : উপসর্গ, কারণ ও চিকিৎসা

অ্যানোরেক্সিয়া মূলত হচ্ছে খাবারের চাহিদা কমে যাওয়ার একটি বিশেষ পর্যায়। যেমন অনেকের বিভিন্ন অসুখ হলে খাবারের চাহিদা কমে যায় যাকে মেডিকেলের ভাষায় অ্যানোরেক্সিয়া বলে। অন্যান্য রোগের কারণে যদি সাময়িক ভাবে খাবার গ্রহণ করার চাহিদা কমে যায় তবে এই কন্ডিশন কে রোগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়না। এটা কয়েক দিন পর ঠিক হয়ে যায় কিন্ত যদি অ্যানোরেক্সিয়ার কারণে দৈনিক যে পরিমান ক্যালরি নেওয়া দরকার তা বন্ধ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে এটা অবশ্যই রোগ বলে বিবেচিত হবে।

এবার আসি মূল আলোচনায়, “অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা”-
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস জনিত এক প্রকার মানসিক রোগ। যে রোগের মূল কারণ রোগীর অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা। তার মধ্যে এমন একটি চিন্তাভাবনার জগত তৈরি হয় যে সে মনে করতে থাকে খাবার খেলেই তার ওজন বেড়ে যাবে এবং তাকে দেখতে বাজে দেখাবে সেই সাথে মনে করে সে সামাজিক ভাবে অন্যদের দ্বারা হেয় প্রতিপন্ন হবে। এরকম চিন্তাভাবনার কারণে যদি কারো খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আসে এবং সে যদি দৈনিক যে পরিমান ক্যালরি নেওয়া দরকার সেটা থেকে বিরত থাকে কিংবা উপবাস থাকা শুরু করে তখন এই অবস্থাকে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা বলা হয়ে থাকে।

কারণঃ

এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর বিভিন্ন কারন গবেষনার মাধ্যমে বের করতে পেরেছেন। তার মধ্যে কিছু বিশেষ কারন তুলে ধরছি।
১.বায়োলোজিক্যাল-

অ্যানোরেক্সিয়ার বায়োলজিক্যাল কিছু কারণ রয়েছে। যেমনঃ কারো জেনেটিক সমস্যা থাকতে পারে। যার কারণে তার ক্ষিধে লাগবে না এবং সে খাবার এড়িয়ে চলবে তবে একরম কেসের অনুপাত খুব কম দেখা যায়।

২.পারিপার্শ্বিকতা-
অনেকের ক্ষেত্রে নিজেদের চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিজেকে চিকন রাখার প্রবণতা গড়ে উঠে এবং সে খাবার কম খায়। এতে করে এক সময় তার অ্যানোরেক্সিয়া ডেভেলপ করতে পারে।

৩.মানসিক কারণঃ
কেউ কেউ অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডির কারণে কিংবা কোনো হতাশা বা বিষাদগ্রস্হতার কারণে খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। সে নিজেকে স্বাস্থ্যবান মনে করে এবং সে নিজে মনে করে যে খাবার না খেলে তার ডিপ্রেশন কমে যাবে। এই চিন্তা থেকে সে খায় না। তখন তা পর্যায়ক্রমে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসাতে রুপ নেয়।

আবার কেউ কেউ এমন আছে যে সে হয়তো কখনো ওভার ওয়েট হয়ে গিয়ে ছিলো অথবা তার ওবেসিটি ডেভেলপ করেছিলো যার কারণে সে হয়তো সামাজিক বুলির স্বীকার হচ্ছিলো এবং সে ওজন কমাতে চাইলো।তখন ওজন কমাতে গিয়ে সে মানসিক ভাবে স্থির করলো যে সে খাবার কম খাবে এবং কম খেতে খেতে এক সময় তার মধ্যে অবসেসিভ চিন্তা চলে আসে।

একদম কম খেয়েও ভালো থাকা যায় এরকম মনেকরে সে খুব দ্রুত নিজের ওজন কমানোর জন্য নিজের সাথে যুদ্ধ শুরু করে দেয়।দেখা যায়, একসময় তার আর ক্ষিদে লাগেনা, সে খাবার খায় না।

এইভাবে কারো কারো ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ খাবার বন্ধ করে কেবল পানি পান করে জীবন ধারণের প্রবণতা চলে আসে এবং সে তাই করে। সে খাবার গ্রহণ পরিপূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এতে করে তার শরীর কোনো নিউট্রিশন পায় না এবং এক সময় এটা লাইফ থ্রেটেনিং কন্ডিশন বা জীবন বিনাশী অবস্থায় রুপ নেয়।

এই ধরণের উপবাস থাকাকে যার পিছনে মূল ভূমিকা রাখে অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা বা সেরকম মানসিক অসুস্থতা। এই অবস্থাকেই বলা হয়ে থাকে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা।

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার উপসর্গঃ

অ্যানোরেক্সিয়ার রোগীরা নিজেদের স্বভাব এবং চালচলন অন্যদের থেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। যদিও প্রচুর শারীরিক এবং আচরণগত পরিবর্তন তাঁরা লুকাতে পারেন না।

শারীরিক পরিবর্তন যেমনঃ
১.
অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া এবং তাদের দেখলে ভীষণ রোগাক্রান্ত মনে হয়।

২৷ কারো সামনে খেতে বসে না। খেলেও নানা ধরনের টালবাহানা করে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। কিংবা খুব অল্প পরিমানে খেয়ে উঠে যায়।

৩। একটা সময় আসে তারা খাবার গ্রহণ পরিপূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং খাবার গ্রহণ না করলেও তার জীবন স্বাভাবিক এমন একটা ভাব দেখায়।

৪। যখন শারীরিক ভাবে ভেংগে পড়ে তখন তারা নিজেদের রোগ বুঝতে পারে তবে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয় না।

৫। খাবার গ্রহণ না করার কারণে তাদের সারাক্ষণ মাথা ঘোরা (ভার্টিগো) থাকে এবং অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগে।

৬। অকারণে শীত শীত অনুভব হয়।

৭। চুল পড়ে যায়।

৮। শরীরের চামড়া শুকিয়ে যায়।

৯। মহিলাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুচক্র বা বন্ধ হয়ে যায়।

১০। তাদের মধ্যে কিছু আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন,
তাদের মধ্যে ওজন বেড়ে যাওয়া এবং খাদ্যে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। যার কারণে ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে নিয়মিত খাবার খায় না এবং বারবার আয়নায় নিজেকে দেখে এবং ওভার ওয়েট হয়ে যাচ্ছে কিনা সে জন্য বারবার ওজন মাপতে থাকে।

১১। দুই দিন না খেয়ে থাকলেও তারা খিদে নেই বা খেয়ে নিয়েছি বলে পরিবারের লোকজন ও বন্ধুবান্ধবেরকে খাবারের সময় এড়িয়ে চলে ।

১২। তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সোস্যাল এনক্সাইটি অথবা ফোবিয়া ডেভেলপ হয়।

১৪। ওজন কমাতে তারা অতিরিক্ত ব্যায়াম করে। দেখা যায় তারা ১০০০ ক্যালরি পরিমান খাবার খেলে এই পরিমাণ ব্যায়াম করে যেন তাদের ১২০০ ক্যালরি এনার্জি লস হয়। এইভাবে দিন দিন তারা রোগাক্রান্ত হতে থাকে।

অ্যানোরেক্সিয়ার চিকিৎসাঃ

অ্যানোরেক্সিয়া যদিও মানসিক রোগ তথাপি যেহেতু এই রোগের প্রভাব শরীর ও মন উভয়ের ওপরেই পড়ে তাই চিকিৎসা পদ্ধতিও নানান রকমের হয়। অ্যানোরেক্সিয়ার রোগীরা যেহেতু starvation কিংবা না খেয়ে থাকার কারণে অপুষ্টিতে ভোগেন তাই তাঁদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে যদি ওজন স্বাভাবিক থাকে তাহলে হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও চিকিৎসা করানো যেতে পারে।

মেডিসিন এবং সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা করানো দরকার হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট কিংবা নিউরোলজিস্ট এর পরামর্শ নিতে হতে পারে। চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রথমেই যা করতে হয় তা হচ্ছে রোগীর নিউট্রিশন ঠিক করা, মুখে না খেলে শীরাপথে সাপ্লিমেন্ট এর মাধ্যমে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরি সাপ্লাই দেয়া হতে পারে।

এইভাবে পর্যায়ক্রমে তাঁদেরকে খাবারের জন্য কাউন্সেলিং করা। যাতে তাদের খাদ্যাভ্যাস ফিরে আসে। এইজন্য তাদেরকে যৌক্তিক ভাবে খাবারের পুষ্টি জ্ঞ্যান দেওয়া যাতে খাবার গ্রহণের উপকার এবং খাবার বর্জণের ক্ষতিকর দিক তারা বুঝতে পারে। এজন্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিষ্ট বা সাইকোথেরাপিস্টদের সহযোগীতা নিতে হতে পারে।

ওজন বেড়ে যাওয়ার যে ভয় তৈরি হয়।তা দূর করতে সঠিক ভাবে তাদের কে বিহেভিয়ার থেরাপি দেওয়া, সঠিকভাবে কাউন্সেলিং করা। এই ক্ষেত্রে রোগীর পরিবারের লোকজনের সাপোর্ট, সহপাঠীদের আন্তরিক সাপোর্ট এবং স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষকদের আন্তরিক মানসিক সাপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা একটা জীবন বিনাশী রোগ। কারণ এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক অবস্থায় রোগী নিজে কিংবা পরিবারের কেউই তা বুঝতে পারে না। যেহেতু এটা মানসিক রোগ তাই রোগী যখন এটা বুঝতে পারে তখন সামাজিক ভাবে হেয় হবার ভয়ে রোগী এটার চিকিৎসা করতেও রাজি হয়না। কারণ গ্রাম গঞ্জে কারো কোনো মানসিক রোগ হলে তাকে পাগল বলে অবিহিত করা হয়। তাই আপনার পরিচিত কারোর মধ্যে যদি অ্যানোরেক্সিয়ার উপসর্গ দেখতে পান তবে সবার আগে তাঁদের চিকিৎসা করাতে রাজি করান।

যেহেতু তাঁরা নিজেদের রোগ কে রোগ হিসাবে বলতে রাজি হয়না,তাই আপনাকে খুব আন্তরিক হয়ে ধৈর্য্য সহকারে তাদের কে তাদের রোগ সম্পর্কে বোঝাতে হবে। খাবার গ্রহণের জন্য তাদের সাথে জোর করে তেমন একটা লাভ হয়না কারণ জোর করে খাওয়ানো হলেও তারা পরে বমি করে তা বের করে ফেলে তাই তাদেরকে খাবারের জন্য জোর করা যাবেনা। যদি পরিবারের কোন সদস্য এনোরেক্সিয়াতে ভোগে তবে পরিবারের বাকি সদস্যগন যাতে নরমাল খাওয়া দাওয়া চালিয়ে যায় সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার।

এতে করে তার মানসিক অবস্থা পরিবর্তন হতে পারে কিংবা ডাক্তার অথবা সাইকোলোজিস্টগণ তখন পরিবারের অন্য সদস্যদের খাবার গ্রহণকে তার সামনে উপমা দিয়ে তাকে সঠিক ভাবে কাউন্সেলিং করতে পারবে।

সেল্ফ কাউন্সেলিং-
কেউ যদি বুঝতে পারে যে সে অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত তখন তার নিজের উচিৎ পরিবার বা বন্ধুবান্ধব কে তা শেয়ার করা এবং এর যৌক্তিক সমাধান বের করা কিংবা ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার ভয়ে খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেওয়ার কারণে যাদের মধ্যে অ্যানোরেক্সিয়া ডেভেলপ করেছে তাদের উচিৎ এই ক্যালরি ও ওজন বৃদ্ধি নিয়ে পড়াশুনা করা এবং এই বিষয় সঠিক জ্ঞ্যান অর্জন করা।

যাতে করে কি পরিমান খাদ্য গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধি পাবেনা এমন একটা আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে তৈরি হবে এবং সে অ্যানোরেক্সিয়া থেকে সহজেই বের হয়ে আসতে পারবে আশা করা যায়।

সবচেয়ে ভালো হয় একজন ডাক্তার এবং ডায়েটিসিয়ানের সাথে পরামর্শ করে একটা সঠিক লাইফ স্টাইল ফলো করা। যাতে করে একটা সুস্বাস্থ্য সমৃদ্ধ জীবন যাপন করা যায়।

চিকিৎসা না করালে যে সব জটিলতা হতে পারেঃ

যেহেতু অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা একটি খাদ্যাভ্যাস জনিত জটিল মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগী খাবার গ্রহণ পরিপূর্ণ ছেড়ে দেয়, সে মনে করে খাবার খেলে ওজন বেড়ে তার শরীর এর গঠন নষ্ট হয়ে যাবে।

এইভাবে না খেতে খেতে তার মধ্যে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। যেমন, অ্যানিমিয়া বা রক্তশুন্যতা, হার্টে মাইটাল ভালব প্রলাপ্স হতে পারে, ইলেক্ট্রোলাইট এর ভারসাম্যহীনতা, কিডনির জটিলতা সহ নানাবিধ হরমোনাল সমস্যা হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।তাই এক্ষেত্রে সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসা করা অপরিহার্য।

ডা. ইসমাইল আজহারি
চিকিৎসক, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
রিসার্চ ফেলো,সেন্টার ফর ক্লিনিক্যাল এক্সিলেন্স এন্ড রিসার্চ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *