কোনো ইস্যু ছাড়াই সাভারের আশুলিয়া এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনে নামিয়েছিল একটি অদৃৃশ্য পক্ষ। একেক জায়গায় একেক কথা বলে শ্রমিকদের রাস্তায় নামানো হয়। তাদের সম্মিলিত কোনো দাবি ছিল না।স্থানীয়রা বলছেন পেছনে থাকা একটি পক্ষের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। পোশাক শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে চক্রটি। আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি অবস্থান নেয় অনেক বহিরাগত। বেতন বৃদ্ধির দাবির কথা বলায় এই আন্দোলনে সাড়া দেন শ্রমিকরা। কিন্তু সেখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি অস্থিশীল করে তোলেন নেতৃত্ব দেয়া এসব বহিরাগতরা। বুধবার ভাঙচুর শুরু করেন বহিরাগতরাই। বন্ধ কারখানাগুলোর শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। আর চালু থাকা কারখানার শ্রমিকদের উত্তেজিত করে বিক্ষোভ করার কথা বলেন।
গতকাল আশুলিয়ায় কয়েকটি এলাকার বেশ কয়েকটি পোশাক ও অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা যায়। আন্দোলনের শুরু হয় যেসব কারখানা থেকে তারমধ্যে একটি আশুলিয়ার পার্ল গার্মেন্টস। তারা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন ২৮শে আগস্ট। শুরুতে তারা মৌখিকভাবে দাবির কথা জানায়। আন্দোলনে অংশ নেয়া এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের মূলত দাবি ছিল হাজিরা বোনাস ৮০০ টাকা করার দাবিতে। এরপর আমরা লিখিতভাবে জানাই। গার্মেসন্ট থেকে আমাদের জানানো হয় বিষয়টি নিয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর আমরা যথারীতি কাজ করছিলাম। এরপর আমাদের সঙ্গে জুয়েল নামে এক ব্যক্তি যোগাযোগ করে। তিনি শিমুলতলা এলাকার দি ড্রেস অ্যান্ড দি আইডিয়াস পোশাক কারখানার শ্রমিক হিসাবে পরিচয় দেন। তার সঙ্গে থাকা সাইফুল ইসলাম পরিচয় দেন জামগড়ের আলীস জেন্টস ড্রেসাপ নামে প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক। দি ড্রেস অ্যান্ড দি আইডিয়াস নামে কারখানার খোঁজ পাওয়া গেলেও আলীস জেন্টস ড্রেসাপ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, এখনই আমাদের সময় বেতন বৃদ্ধি করার। আমাদের শুধু বেতন ও ওভার টাইম হাজিরা ৮০০ টাকা করার কথাই বলা হয়। গত ২৯শে আগস্ট আমাদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। আমরা কি করবো তখন বুঝতে পারছিলাম না। এরপর সেদিন রাতে এই দুই নেতা আবারও আসেন। তারা বলেন, এখুনি সময় দাবি আদায় করে নেবার। এখন নতুন সরকার আমাদের দাবি তুলে বেতন বাড়িয়ে নিতে হবে। গত ৩১শে আগস্ট আমরা মাঠে নামি। কারণ হিসেবে বলেন, আমাদের বেতন খুবই কম। আমরা প্রচুর পরিশ্রম করি। একটা আন্দোলন করে যদি বেতন বাড়িয়ে নেয়া যায় তাহলে ক্ষতি কি?
৩১শে আগস্ট আন্দোলনে নামা আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা আমাদের দাবি জানিয়ে সড়কে বিক্ষোভ করছিলাম। এ সময় কিছু লোক এসে বলতেছে সড়ক আটকাইতে। আন্দোলনে অধিকাংশই ছিল নারীকর্মী। তারা নানা ধরনের উসকানি দিয়ে তাদের সামনে পাঠিয়ে দেয়। ইসমত আরা নামে এক সুইং অপারেটর বলেন, আমরা স্ল্লোগান দিচ্ছিলাম আর যাদের চিনি না তারা ঢিল মারছিল। আর লাঠি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভাঙছিল। এরপর আমাদের অনেকেই ঢিল দেয় কিন্তু তারা শুরু করে দিয়ে পিছনে চলে যায়।
অত্র এলাকার একটি সিরামিক ও পোশাক কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়। সিরামিক কারখানাটি নির্দিষ্ট কোনো কারখানার নয়। এখানে বিভিন্ন কারখানার উদ্বৃত্ত কাজ করা হয়। এই সিরামিকের সামনে থাকা দোকানদারদের সঙ্গে ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। গত ৪ তারিখ আন্দোলন করছিলেন শ্রমিকরা। এ সময় একদল লোক এসে দেয়াল টপকে ঢুকে পড়ে কারখানায়। এরপর তারা একটি পকেট গেট খুলে দিয়ে বের হয়ে আসে। সেখানে প্রবেশ করে আন্দোলনকারীরা। কিছু সময় থাকার পর পুলিশ চলে আসায় সরে যায় তারা। সাঈদ নামে এক দোকানদার বলেন, যারা লাঠিসোটা হাতে প্রথম ঢুকেছিল তাদের আগে দেখি নাই। আর তাদের দেখে মনেও হচ্ছিল না শ্রমিক। তারা সামনে থাকা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকদের লাঠি তুলে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেয়। একজনকে চড় থাপ্পড়ও মেরেছে। দোকানে থাকা শহিদুল ইসলাম বলেন, এরা আন্দোলনকারীদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে পাহারা দিচ্ছিল আর উসকানি দিচ্ছিল যাতে ভাঙচুর করে। আগুন লাগিয়ে দেয়ার কথাও বলছিল। তারা সংখ্যায় আট থেকে ১০ জনের মতো ছিল।
আশুলিয়ার জামগড় এলাকায় রয়েছে বেশক’টি গার্মেন্ট। এই এলাকায় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক বেশ জোরালোভাবে ক’দিন ধরে আন্দোলন করেন। গত ৪ তারিখ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়। গতকাল জোহরের নামাজের পর বেশ কয়েকজন আলোচনা করছিলেন। এ সময় শরিফুল নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের বেতন যে খুবই কম এটাতো মানতেই হবে। তবে আমরা চাই না আমাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের বেতনের দাবি কাজে লাগিয়ে একপক্ষ আমাদের সামনে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা যে ব্যবহার হচ্ছি- সেটাও বুঝতে পারতেছি। তাদের আন্দোলনে নামার জন্য একত্র করেছেন সজীব নামে এক ব্যক্তি। তিনি গাজীপুরের শ্রমিক নেতা বলে পরিচয় দেন তাদের। তার সঙ্গে ছিল আরেক ব্যক্তি। তারা কেউই ফোনে যোগাযোগ করতেন না। তারা আমাদের বলেন- আপানার শুধু আন্দোলনে নামবেন। আমরা আপনাদের দাবি নিয়ে কথা বলবো। এরপর গত মঙ্গলবার ও বুধবার জামগড় সড়কে তারা আগেই উপস্থিত ছিলেন। তারা আমাদের পিছনে রেখে সামনে সড়কে আগেই নেমে যায়। এরপর আমরা যাই প্রথমে তারা স্লোগান ধরে। এরপর সরে আসে।
গত বুধবারে গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ১০/১৫ জনের এই গ্রুপটা আমাদের নানা বক্তব্য দিয়ে উত্তেজিত করে তোলে। তারা বলে, আমাদের রক্ত-ঘামে ইনকাম করে তারা বিলাসবহুল বাড়িতে থাকে। গাড়িতে চড়ে। আমাদের পেটে ভাত জোটে না। এসব নানা কথা বলে ক্ষিপ্ত করে তোলে। এরপর তাদের কয়েকজন লোক গাড়িকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে থাকে। এই তিনজনের বাইরে শ্রমিকদের ক্ষিপ্ত করে তোলার কাজ করেন ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় নামে এক ব্যক্তি। তিনি আন্দোলন চলাবস্থায় মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে শ্রমিকদের উত্তপ্ত করে তুলতেন। তার সঙ্গে থাকা আর দুই মোটরসাইকেলে থাকা চারজন কাউকে ভিডিও করতে দিতেন না। এক আন্দোলনকারী তার কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে বলতে শোনা যায়, আপনাদের গার্মেন্ট মালিকরা আপনাদের টাকা দিচ্ছে না। আপনাদের শ্রম দিয়ে যে মেশিন চলে সেই মেশিন দিয়ে তারা টাকা ইনকাম করে। আপনারা টাকা আদায়ে রাস্তায় থাকবেন না আপনারা গার্মেন্টে যান। যে মেশিন দিয়ে পোশাক বানান সেই মেশিনগুলো ছিনিয়ে নিয়ে আসুন।
এই উসকানি দেয়া চার ব্যক্তির পরিচয় জানতে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা হয়। অধিকাংশরাই তাদের ঠিকমতো চেনেন না। আবার অনেকেই বলেন, এই চারজনই সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানের লোক। তবে এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিন্তু কেন এই বিশৃঙ্খলা? এই বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান। এটা মূলত ঝুট ব্যবসার কারণে। গার্মেন্টে কোটি কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা হয়। যেগুলো মূলত স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন তাদের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ায় এই ব্যবসা হাত ছাড়া হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই একটা পক্ষ শ্রমিকদের উসকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবার চেষ্টা করছে কিংবা নতুন যারা ব্যবসার হাল ধরবেন তারা এগুলো করাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কারখানায় কাজ চলছে। কয়েকটি কারখানার সামনে বিক্ষোভ করছিলেন শ্রমিকরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারাও চোখে পড়ে। সেইসঙ্গে কারখানার স্টাফরাও লাঠিহাতে পাহারা দিচ্ছিলেন।













