টাঙ্গাইল সদর উপজেলার জাঙ্গালিয়া ও কলাবাগান এলাকা জুড়ে যমুনা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সেকশন–কাটার ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন। নদীর ঠিক সেই অংশে—যেখান থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা যমুনা বহুমুখী সেতু ও যমুনা রেলসেতু মাত্র চার কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত। এলাকাবাসীর দাবি—এই বেপরোয়া উত্তোলনের কারণে যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে এবং ঝুঁকিতে পড়তে পারে সেতু ও নদী তীরবর্তী কয়েক হাজার বাড়িঘর।
দস্যু বাহিনীর আধিপত্য,আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া—আতঙ্কে স্থানীয়রা নদী রক্ষা কমিটি ও একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে একটি সংগঠিত দস্যু চক্র অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এলাকাজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করে অবৈধ ড্রেজার পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে—এই চক্রের নেতৃত্বে আছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি, যাদের নাম বাপ্পি, জয়নাল, পান্না ও জহুরুল হিসেবে উল্লেখ করেন সাক্ষাৎকারদাতারা। তাদের দলে নাকি ৩০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে, যাদের অনেকেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ।
সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়—নদীর বুকে একটি শক্তিশালী ড্রেজার পুরো সক্ষমতায় চলছে। পাশে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন যুবককে উত্তোলিত বালু পরিবহনে নিয়োজিত শ্রমিক ও নৌকার স্টাফদের নানা নির্দেশনা দিতে দেখা যায়।
স্থানীয়রা জানান, এই চক্রের বহু সদস্য অতীতে সর্বহারা দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে তারা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও পরবর্তীতে সরকারি পুনর্বাসন সুবিধা বিক্রি করে আবার পুরোনো দস্যুবৃত্তিতে ফিরে যায়। অভিযোগ রয়েছে—তারা নদীপথে চলাচলরত বালুবাহী বলহেড ও নৌযানের স্টাফদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকলেও এখনো ধরা–ছোঁয়ার বাইরে।
আইন যা বলে:স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির বিধান ১.বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী—সেতু, কালভার্ট, নদীতীর রক্ষা কাজ, বাঁধ, জনবসতি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিকট থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ধারা ১৫ অনুসারে শাস্তি:প্রথমবার অপরাধ: সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড / সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা জরিমানা / উভয়দণ্ড পুনরায় অপরাধ: সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড / সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ টাকা জরিমানা ব্যবহৃত মেশিন, নৌকা, যানবাহন বাজেয়াপ্তযোগ্য ২.পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ নদীর পরিবেশগত ক্ষতি বা অনুমোদন ছাড়া ড্রেজিং করলে—ধারা ৬ ও ৭ অনুযায়ী:
সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা পুনরাবৃত্তিতে শাস্তি বেড়ে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা
এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেন এই বালু–মাফিয়ারা শক্তিশালী হয়ে উঠছে—প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী। প্রশাসনের বক্তব্য এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সচিব) ড.কামরুজ্জামান এনডিসি গণমাধ্যমকে বলেন—বালু উত্তোলনে আইন লঙ্ঘন ও পরিবেশের ক্ষতি প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান—“কিছুদিন আগে বড়ইতলা এলাকায় একটি ড্রেজার বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল; আমরা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছি। জেলাজুড়ে যেন আর কেউ অবৈধ ড্রেজার বসাতে না পারে—তা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।”
টাঙ্গাইল জেলা নৌ–পুলিশের পুলিশ সুপার জানান—“নদীপথে চাঁদাবাজির বিষয়ে আমি অবগত নই। অবৈধ ড্রেজার বসানোর একটি প্রচেষ্টা রোধ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আপনারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।
কিন্তু নদীতে চলাচলকারী বালুবাহী বলহেডের শ্রমিকেরা ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তাদের দাবি নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে, এবং তারা প্রতিনিয়ত ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে যাতায়াত করছেন।
সেতু–নিরাপত্তা ও পরিবেশে ভয়াবহ ঝুঁকি
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে,এভাবে সেতুর নিকটবর্তী এলাকায় তলদেশ কাটতে থাকলে—
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যায় বিপজ্জনক গর্ত তৈরি হয় তীরভাঙন দ্রুতগতিতে বাড়ে সেতুর পিলার ও বেসমেন্ট দুর্বল হয়ে বিপর্যয় ঘটতে পারে দেশের বৃহত্তম সেতুগুলোর একটির এত কাছাকাছি অবৈধ বালু উত্তোলন নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি।
উপসংহার:জাঙ্গালিয়া–কলাবাগান এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে বালু সিন্ডিকেটের দাপট এখনো কমেনি।
যমুনা বহুমুখী সেতু, রেলসেতু এবং হাজারো মানুষের বসতবাড়ি ঝুঁকির মুখে—এ সত্য আর লুকোনোর সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইনের এত কঠোরতা সত্ত্বেও দস্যু চক্রের এই দৌরাত্ম্য থামবে কবে?













