চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক ‘এভিয়েশন হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বিমানবন্দরটির রানওয়ে সম্প্রসারণ, পৃথক ট্রানজিট সেন্টার এবং কার্গো ভিলেজ নির্মাণ করা হবে।
এতে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সাথে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের সাথে সরাসরি আকাশ পথে যোগাযোগ স্থাপন হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘আন্তর্জাতিক’ বিমানবন্দর হলেও দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কিছু রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানকার অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্বমুখী অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি আকাশপথে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক ব্যবসায়ীদের পক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে বিষয়টি নিয়ে একটি পত্র পাঠান। পত্রে বিমানবন্দরটির উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয়। তাতে সাড়া দিয়ে সরকার দ্রুতই দীর্ঘদিনের এই সীমাবদ্ধতা দূর করে চট্টগ্রামের সাথে আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বহুমুখী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
ইতোমধ্যে ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) যৌথ সমন্বয়ে ইতোমধ্যে প্রকল্পের একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপে ‘কুইক-উইন ফেজ’ বা দ্রুত অবকাঠামো সংস্কার করে বড় আকারের (ওয়াইড-বডি) উড়োজাহাজ ওঠানামা নিশ্চিত করা এবং ট্রানজিট যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
প্রসঙ্গত, ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এখান থেকে চীন, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরে সরাসরি ফ্লাইট চালু ছিল; কিন্তু নানা সময়ে অবকাঠামোগত সংকট ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামের রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রীদের সেসব গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ঢাকা বিমানবন্দর কিংবা বিদেশি সংযোগকারী বিমানবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বহুলাংশে বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্গো পরিবহনে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। এতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিমানবন্দরটির বর্তমান রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। প্রকল্পের আওতায় এটি পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার ৬০০ মিটারে উন্নীত করা হবে। উড়োজাহাজ পার্কিং স্ট্যান্ড থাকবে ১১টি (ন্যারো-বডি), ওয়াইড-বডি পার্কিং স্ট্যান্ড থাকবে ৮টি। বার্ষিক যাত্রী সক্ষমতা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি করা হবে। বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা দু’টি থেকে বাড়িয়ে ছয়টি (যার মধ্যে চারটি ওয়াইড-বডির উপযোগী) করা হবে। ১০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে চালু করা হবে পৃথক ট্রানজিট সেন্টার। এছাড়া রানওয়ে শক্তিশালীকরণ, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ এবং দ্রুত প্রস্থান বা র্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কিংবা এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০-এর মতো বিশ্বের সর্বাধুনিক ও বৃহদাকৃতির বিমানগুলো চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অনায়াসে অবতরণ করতে পারবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে দেশের বেশির ভাগ আমদানি-রপ্তানি পরিচালিত হলেও পচনশীল পণ্য, তৈরি পোশাকের উচ্চমূল্যের নমুনা, ইলেকট্রনিকস এবং জরুরি ওষুধপত্রের আন্তর্জাতিক পরিবহনে আকাশপথই একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে সেই সেবাও অনেকটা সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়েছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। একটি নতুন কার্গো ভিলেজ নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনা এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপন করা হবে। এতে পচনশীল কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও ওষুধসামগ্রী সরাসরি চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পথ সুগম হবে। তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রেতারা দ্রুত চট্টগ্রাম সফর করতে পারবেন এবং তৈরি পোশাকের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল চীন থেকে সরাসরি আনা অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় আনুমানিক ৩০০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারি ও সহযোগী খাত থেকে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। ফাস্টট্র্যাক এই মেগা প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ঋণ বা অর্থ সহায়তা চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি); যার পরিমাণ প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার জোগাবে বাংলাদেশ সরকার এবং বেবিচক। এছাড়া বিমানবন্দরের আশপাশে হোটেল, শপিং মল, কমার্শিয়াল স্পেস এবং অন্যান্য সেবামূলক অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বাসস-কে বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানগত বাস্তবতায় চট্টগ্রাম অনেক আগেই এই অঞ্চলের আকাশ যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এতদিনেও তা হয়নি, এটা দুঃখজনক। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৫ আগস্ট আমি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে একটি পত্র প্রেরণ করি। মাননীয় অর্থমন্ত্রী পত্র পাওয়ার পর আমাদের দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ নামে ফাস্টট্র্যাক মেগা প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। এটা এক কথায় ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আমরা চাই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। এতে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থান যেমন দ্রুত বদলে যাবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতির সঞ্চার হবে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের মূলকেন্দ্র অনেকটা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ধাবিত হয়েছে। বিশেষ করে চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন কার্যক্রম বিগত দুই দশকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের উপস্থিতি এখন উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ না থাকায় একটা নেতিবাচক পরিস্থিতি আমরা দেখছি। প্রস্তাবিত এয়ার হাব প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সেদিক থেকেও একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মো. আছিফ চৌধুরী বাসস-কে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে এই অঞ্চলের এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কার্গো ভিলেজ, চেকিং কাউন্টার, বোর্ডিং ব্রিজ, লাগেজ বেল্ট ও যাত্রীদের জন্য উন্নত লাউঞ্জ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বিমানবন্দরটি সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চালু থাকে। এটিকে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের ৭ দিন চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের ল্যান্ডিং চার্জ (অবতরণ মাশুল) প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে আনতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করতে কার্যকর বিপণন ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম চালাতে হবে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, হংকং ও তাইওয়ানসহ পূর্ব এশিয়ামুখী বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে জ্বালানি ভরার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা গতি পাবে এবং এর মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন বাসস-কে বলেন, ‘কোনো উড়োজাহাজ এখানে অবতরণের পর যদি তাদের সমস্ত আনুষাঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা যেমন— হোটেল সুবিধা, জ্বালানি নেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা পায় তখনই তারা এই বিমানবন্দরটিকে একটি ‘হাব’ হিসেবে গণ্য করবে। একবার এটি অর্জিত হলে, পৃথিবীর প্রায় সব এয়ারলাইন কোম্পানিকে আকৃষ্ট করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানেও এই বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার মতো অবকাঠামো রয়েছে, যার মধ্যে সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি কার্গো ফ্লাইটও অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য এয়ারলাইনগুলোকে কার্যকর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যদি এয়ারলাইনের ফ্লাইটের সংখ্যা এবং সহায়ক অবকাঠামো বাড়ানো যায়, তবে এই বিমানবন্দরটি দেশের একটি বিকল্প হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ট্রানজিট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এয়ারলাইনগুলোর এমন চাহিদা থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা যাত্রীদের নিজ দেশ থেকে চট্টগ্রাম হয়ে অন্য গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে। তাই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে, কারিগরি যাত্রাবিরতি বা ‘টেকনিক্যাল স্টপওভার’ সেবা প্রদানের ওপর মনোযোগ দেওয়াটা বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯ লাখ ৭৭ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন করেছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল। কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।










