দিনমজুরির টাকায় পাঠাগার

Uncategorized সংস্কৃতি

উলিপুরের বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সাতভিটা গ্রাম। নুন আনতে পান্তা ফুরাতো জয়নালদের। চার ভাই-বোনের সংসার। ভাইদের মধ্যে জয়নাল বড়। ২০০১ সাল। জয়নাল তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এ সময় বাবাকে হারান। সেই থেকে আর স্কুলের বারান্দায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সংসারের বড় বোঝা চাপে ছোট্ট জয়নালের কাঁধে। এক প্রতিবেশীর সঙ্গে চলে এলেন গাজীপুরে। কোনাবাড়ীতে এক ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে ‘কর্মজীবন’ শুরু কিশোর জয়নালের।

মাঝরাত থেকে দুুপুর পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি। দিনে ১৩০ টাকার মতো পেতেন। মজুরির একটা অংশ দিয়ে ফুটপাত থেকে পুরনো বই কিনতেন। বিশ্ব ইজতেমার সময় টঙ্গীতে ২০ টাকা দরে বই বিক্রি হতো। সেখান থেকেও কিনেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস। অবসরে অন্যরা যখন চায়ের দোকানে আড্ডায় মশগুল, জয়নাল তখন বই নিয়ে বসতেন। ঈদের ছুটির সময় বাড়ি এলে বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে বই চেয়ে নিতেন। পড়া হয়ে গেলে এসব বই জমিয়ে রাখতেন।

এবার পাঠাগার
এভাবে একসময় ২০০টির মতো বই জমা হয়ে যায়। তখনো বাড়িতে কোনো বুকশেলফ বা আলমারি ছিল না। জয়নালের স্বপ্ন ছিল এক দিন তাঁর একটা বুকশেলফ হবে। হবে পাঠাগার। সেই স্বপ্ন ধরা দেয় ২০১১ সালে। নিজের জমানো অর্থ এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় ১৬ হাজার টাকায় একটি বুকশেলফ তৈরি করেন জয়নাল। এরপর গ্রামের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাতভিটা গ্রন্থনীড়’।

স্বপ্ন থমকে গেল
কাজের সূত্রে জয়নালকে একেক সময় একেক জেলায় চলে যেতে হয়। ফলে পাঠাগারটিও ঠিকমতো খোলা হয় না। এভাবে বছর দুয়েকের মাথায় বন্ধ হয়ে যায় স্বপ্নের পাঠাগার। বললেন, ‘ভাই, কাম না করলে পেট তো চলে না। কখনো মাটি কাটা, কখনো ধান কাটার মৌসুমে বিভিন্ন জেলায় চলে যেতাম। বাইরে থাকলে পাঠাগারও বন্ধ থাকত।’ স্বপ্নপূরণের পথে আকস্মিক এই বিপত্তিতে চরম হতাশায় ভোগেন জয়নাল।

পাঠাগার নিয়ে কত স্বপ্ন বুনেছিলেন। মাঝপথেই তা অধরা রয়ে যাবে? এখানেও জয়নালকে প্রেরণা জোগায় বই। ম্যাক্সিম গোর্কি, এ পি জে আব্দুুল কালাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ অনেকের জীবনী পড়েছিলেন। দেখেছেন, দুঃসময়ে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়ে সফল হয়েছেন তাঁরা। নিজেই নিজেকে সান্তনা দিলেন ‘হাল ছাড়া যাবে না।’

আবার চালু করলেন
নতুন উদ্যমে আবার বই সংগ্রহ শুরু করেন। ঠিক করেন যদ্দিন পাঠাগার চালু না হয় নিজেই বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেবেন। ২০১৬ সালে পাকাপোক্তভাবে বাড়িতে ফেরার পর শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই পৌঁছে দিতে শুরু করলেন। একেকটা বই পড়া হয়ে গেলে আবার নতুন বই দিতেন। পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহও করতে শুরু করলেন। এভাবে নতুন করে আরো দুই শতাধিক বই সংগ্রহ হয়ে গেল তাঁর। সেই বই নিয়েই ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়িতে আবার চালু করলেন সাতভিটা গ্রন্থনীড়।

এবার ভিটেমাটি
ধীরে ধীরে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। ২০১৯ সালে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় এক শতক জমি কিনলেন। স্বপ্ন ছিল সেই জমিতে ঘর তুলবেন। সে জন্য টাকা জমাতে শুরু করেছিলেন। গেল বছর সেই জমিতে ঘর দিলেন। ভিটার মাটি কাটতে কুড়ি দিনের মতো লেগেছিল জয়নালের। ঘর ও আসবাবপত্র নির্মাণে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। যার বেশির ভাগই দিনমজুরির টাকায়, এলাকাবাসীও সহযোগিতা করেছে। এখন জয়নালের পাঠাগারে একটা বুকশেলফ, দুটি টেবিল ও ছয়টা চেয়ার আছে।

পাঠাগারে বই আছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, আত্মজীবনীসহ প্রায় ছয় শর মতো। দিনমজুরি করে ফিরে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা রাখেন। পাঠাগারে দৈনিক গড়ে ১৫ জন পাঠক আসে। অভাবে নিজে পড়তে পারেননি। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর একজন ছাত্রকে এসএসসির ফরম পূরণের ফি দেন জয়নাল।

জয়নাল বলেন
জয়নালের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখনো তিনি অন্যের জমিতে ধান কাটছিলেন। বললেন, ‘ভাই, আর ঘণ্টাখানেক পরে কাম শ্যাষ হবে।’ ঘণ্টাখানেক পর আবার ফোন দিলাম। এবার তিনি জমির আইলে। হাসিমুখেই বললেন, ‘ভাই, আমি দিনমজুর। অভাব-অনটনের কারণে ডিগ্রি নিতে পারি নাই। কিন্তু আমি চাই, আর কেউ যেন আমার মতো অবস্থায় না পড়ে। তাই পাঠাগার গড়ছি।

আমার বেশি কিছু চাহিদা নাই। কোনো মতে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারলেই হলো। জানি, বই কখনো মানুষকে ঠকায় না। এলাকার একজন মানুষকেও যদি জাগায়ে তুলতে পারি তাতেই খুশি আমি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *