মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরকারি, বাঘুটিয়া বাজার, কাশিধারামপুর ও তিশি এলাকায় যমুনা নদী থেকে প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স ও তার প্রধান সহযোগী সফিকুল ইসলাম সফিকের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিন-রাত ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদী তীরবর্তী কয়েক হাজার মানুষের বসতি এবং যমুনার বুকে স্থাপিত জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মহামান্য হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জিন্নাহ কবিরের নির্দেশনাকেও উপেক্ষা করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বালু মাফিয়া চক্রটি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র পাহারায় ড্রেজার পরিচালনা করে তারা বালু উত্তোলন করছে, ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাঘুটিয়ার তিশি এলাকায় যমুনা নদীতে অন্তত চারটি ড্রেজার বসিয়ে প্রায় ৫০টির বেশি বাল্কহেডে বালু উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীরা দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিয়ান নুরেনকে মোবাইল ফোনে অবহিত করলে তিনি অভিযান পরিচালনা করে ড্রেজারগুলোতে জরিমানা আরোপ ও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক অভিযানের মাত্র একদিন পরই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাঘুটিয়ার তিশি এলাকায় পুনরায় পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে শতাধিক বাল্কহেডে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। এ সময় একটি ট্রলারে প্রায় ১০-১২ জন সশস্ত্র ব্যক্তির পাহারায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন স্থানীয়রা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের নিকটবর্তী স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এতে যে কোনো সময় ভয়াবহ নদীভাঙন, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইন অনুযায়ী, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৬২ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিশেষ করে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকার নিকট থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই অপরাধ বারবার সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, ২ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও মালামাল জব্দ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ ও সদিচ্ছা নিয়ে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করছি।”তবে স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জেলা প্রশাসকের এমন বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। তাদের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বালু মাফিয়ারা আবারও আগের মতো কার্যক্রম শুরু করে দেয়। ফলে প্রশাসনের অভিযানের কার্যকারিতা ও কঠোরতা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে স্থায়ীভাবে ড্রেজার উচ্ছেদ, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নিলে যমুনা তীরবর্তী জনপদ ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।













