মানিকগঞ্জ দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চর বাঘুটিয়া এলাকায় যমুনা নদীকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছে একটি সংঘবদ্ধ বালু মাফিয়া চক্র। গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে ও নির্বিঘ্নে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজিং মেশিন বসিয়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সশস্ত্র পাহারায় চলছে এই বেআইনি কার্যক্রম।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাঘুটিয়া বাজার এলাকা থেকে শুরু করে উজান অংশ পর্যন্ত যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে একাধিক ড্রেজার। দিন-রাত অবিরাম বালু উত্তোলন করা হলেও প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে পড়েনি। বরং পুরো এলাকাজুড়ে রয়েছে বালু মাফিয়াদের নিয়োজিত লোকজনের কড়া নজরদারি।
সশস্ত্র পাহারায় মুখ বন্ধ স্থানীয়দের
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বালু উত্তোলনস্থলে থাকা পাহারাদাররা আগ্নেয়াস্ত্রসহ সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করে। ফলে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“প্রতিবাদ করলেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।” নদীভাঙনের মুখে শত শত বসতবাড়ি
অবৈধ ড্রেজিংয়ের সরাসরি প্রভাবে যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকাজুড়ে ভয়াবহ ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও গভীরতা নষ্ট হওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের নদীভাঙন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে বহু বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গ্রামীণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নৌপথেও বালু মাফিয়ার দখল অনুসন্ধানে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সিরাজগঞ্জ থেকে পাটুরিয়া নৌপথে চলাচলকারী বৈধ বাল্কহেডের মাঝি-মাল্লাদের জিম্মি করে তাদের জোরপূর্বক অবৈধ বালু আনলোড করতে বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ এতে অস্বীকৃতি জানালে মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্সের নেতৃত্বাধীন লোকজন তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা, শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।
একাধিক মাঝি জানান, নৌপথে চলাচল এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অবৈধ বালু ব্যবসার স্বার্থে নৌযান চালকদের কার্যত বন্দি করে রাখা হচ্ছে।
প্রশাসনের আশ্বাস, বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিয়ান নুরেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন,
“বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। খোঁজখবর নিয়ে অবৈধ ড্রেজিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতেও মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালিত হলেও তা ছিল সাময়িক ও লোক দেখানো। অভিযান শেষ হলেই আবার আগের মতো শুরু হয় অবৈধ ড্রেজিং। ফলে প্রশাসনের আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না তারা।
কার্যকর অভিযানের দাবি এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে স্থায়ী ও কঠোর অভিযান, ড্রেজার জব্দ, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত না করা হলে যমুনা নদীর তীরবর্তী জনপদ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করারও দাবি জানান।
এখন প্রশ্ন একটাই—প্রশাসনের ঘোষিত কঠোর ব্যবস্থায় আদৌ কি থামবে দৌলতপুরের বাঘুটিয়া এলাকার এই বেপরোয়া বালু মাফিয়া চক্র, নাকি যমুনা নদী ও তার পাড়ের মানুষ আরও বড় সর্বনাশের দিকে এগিয়ে যাবে?













