মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চরে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন যমুনা নদীতে পুনরায় শুরু হয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন—যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের সাময়িক অভিযান ও জরিমানার পরও এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ এপ্রিল উপজেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আরোপ করা হলেও কয়েক দিনের ব্যবধানে একই স্থানে পুনরায় পুরোদমে বালু উত্তোলন শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোকদিয়া চরের নদী অংশে জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় অন্তত চারটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। প্রতিদিন শতাধিক বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার আর্থিক লেনদেন কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নদীর তলদেশ গভীরভাবে খনন করার ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে আশপাশের শতাধিক বসতবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র এই অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তাদের সহায়তায় বাইরের একটি সশস্ত্র গ্রুপ ঘটনাস্থলে অবস্থান করে ড্রেজার কার্যক্রম পাহারা দিচ্ছে, যার কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারছেন না। প্রশাসনের দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর গণস্বাক্ষরসহ লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,“বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০”-এর ৬২ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং জনবসতির নিকটবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ফৌজদারি অপরাধের শামিল এবং এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তদুপরি, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা জানিয়েছেন, “জাতীয় গ্রিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে অবৈধ বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র নির্দেশ নয়—দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ব্যবহৃত ড্রেজার জব্দ এবং স্থায়ীভাবে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—প্রশাসনের এই নীরবতা কি নিছক অবহেলা, নাকি অবৈধ বালু মাফিয়াদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগসাজশের ফল? দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারেন।













