মানিকগঞ্জের শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী দুর্গম চরাঞ্চল—বিশেষ করে তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়ার চর—ক্রমশ অবৈধ বালু উত্তোলনকারী সংঘবদ্ধ চক্রের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের উপস্থিতি দুর্বল এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার সুযোগে এসব চক্র এখন সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার করে এলাকায় কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান (তারিখ: ১২ ও ১৩ই এপ্রিল ২০২৬):আলোকদিয়ার চর এলাকায় জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন স্থানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত দুইটি অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে একাধিক বাল্কহেডে বালু লোড ও আনলোড করা হচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল এসব অবৈধ ড্রেজার পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে, যা স্পষ্টতই দণ্ডবিধি ও সংশ্লিষ্ট খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
সশস্ত্র চাঁদাবাজি ও নৌদস্যুতা:একই এলাকায় সেলো ইঞ্জিনচালিত একটি ট্রলারে অবস্থানরত কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি সংঘবদ্ধভাবে যমুনা নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে অবরুদ্ধ করে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা প্রতি নৌযান থেকে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ।অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা: অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলমান রয়েছে। এর জেরে এলাকায় নিয়মিত সংঘর্ষ, রক্তক্ষয়ী হামলা এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পুরো চরাঞ্চল কার্যত আইনের শাসনের বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য:শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা রানী কর্মকার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে তিনি একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছেন। তবে প্রতিবারই অভিযানের পূর্বাভাস পেয়ে সংশ্লিষ্ট চক্র পালিয়ে যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুর্গম চরাঞ্চলে অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; সশস্ত্র প্রতিরোধের আশঙ্কা সবসময় বিদ্যমান থাকে, এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নৌপুলিশের প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা: পাটুরিয়া নৌপুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চাঁদাবাজির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পাননি বলে দাবি করেন এবং অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে নৌযান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ—তারা বারবার নৌপুলিশকে অবহিত করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও সম্ভাব্য যোগসাজশের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করছে।
আইনি মূল্যায়ন:উল্লিখিত ঘটনাবলি বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, খনিজ সম্পদ (বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০১০, এবং নৌপথ নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রযোজ্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবৈধ বালু উত্তোলন, সশস্ত্র চাঁদাবাজি, নৌদস্যুতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রের উপস্থিতি নির্দেশ করে, যা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।
উপসংহার:আলোকদিয়ার চরসহ সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চলে দ্রুত যৌথবাহিনীর সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ব্যতীত পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব নয়। অন্যথায়, যমুনা তীরবর্তী এই অঞ্চল ক্রমেই অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে সাধারণ জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।








