মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার যমুনা নদীসংলগ্ন দুর্গম চরাঞ্চল, বিশেষত তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়ার চর, বর্তমানে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী সংঘবদ্ধ সশস্ত্র চক্রের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক উপস্থিতির সীমাবদ্ধতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে পুঁজি করে উক্ত চক্রসমূহ সেখানে কার্যত সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সরেজমিন তদন্ত (১২ ও ১৩ এপ্রিল ২০২৬):
ঘটনাস্থলে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হতে দেখা যায়। একই সঙ্গে বাল্কহেডযোগে উত্তোলিত বালু পরিবহন ও লেনদেন চলমান ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আনুমানিক ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল অবৈধ কার্যক্রমে নিরাপত্তা প্রদান করছে, যা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও “বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০”-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
নৌপথে সশস্ত্র চাঁদাবাজি ও দস্যুতার অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে যে, সেলো ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে অবস্থানরত সংঘবদ্ধ সশস্ত্র ব্যক্তিরা যমুনা নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে অবরোধ করে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করছে। প্রতি নৌযান থেকে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। চাঁদা প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে দেশীয় অস্ত্রের মাধ্যমে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য।
সংঘবদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা:
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব দ্বন্দ্বের জেরে নিয়মিত সংঘর্ষ, গুরুতর আহত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ফলে উক্ত চরাঞ্চল কার্যত আইনের আওতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এবং জননিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান: শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা রানী কর্মকার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হলেও পূর্বাভাস পেয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধচক্র ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তিনি উল্লেখ করেন, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের ঝুঁকির কারণে কার্যকর অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
নৌপুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
পাটুরিয়া নৌপুলিশ কর্তৃপক্ষ চাঁদাবাজির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে নৌযান সংশ্লিষ্টদের দাবি, একাধিকবার অবহিত করা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও সম্ভাব্য গাফিলতি কিংবা যোগসাজশের প্রশ্ন উত্থাপন করছে।
আইনি বিশ্লেষণ:
উক্ত ঘটনাসমূহ বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, “বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০”, এবং প্রযোজ্য নৌপথ নিরাপত্তা আইনসমূহের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবৈধ খনিজ সম্পদ উত্তোলন, সশস্ত্র চাঁদাবাজি, নৌদস্যুতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রমের সমন্বয়ে এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রের কার্যক্রম হিসেবে প্রতীয়মান, যা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হুমকি।
উপসংহার:
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, আলোকদিয়ার চরসহ সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চলে অবিলম্বে যৌথবাহিনীর সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, অঞ্চলটি ক্রমেই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের স্থায়ী অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে সাধারণ জনগণের জীবন, সম্পদ ও নৌপথ নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।








