সর্বশেষ

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা, বাসাবাড়িতে পানি

অনলাইন ডেস্ক

ছয় ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক জলাবদ্ধতা। তলিয়ে যায় রাজপথ থেকে গলিপথ। সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। অনেক স্থানে বাসাবাড়ি, অফিস প্রাঙ্গণেও ওঠে পানি। ঢাকার নিচু অঞ্চলের অনেক জায়গায় বুকসমান পানিতে বন্দি হয়ে পড়ে মানুষ।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত কখনো হালকা ও কখনো মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে থমকে যায় জনজীবন। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র সবখানেই জমে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও যানবাহন বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজট, কোথাও দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবার কোথাও নোংরা পানিতে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন মানুষ। প্রতি বছর বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও রাজধানীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। অথচ গত ছয় বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু সেই বিপুল ব্যয়ের প্রতিফলন শূন্যই দেখতে পেল নগরবাসী।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ১৭৫ মিলিমিটার। যা প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে ঢাকায় এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে ২০০৯ সালে এক দিনে ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। টানা এ বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, মতিঝিল, আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, পূর্ব জুরাইন, লালবাগ, কাজীপাড়া, রোকেয়া সরণি, মিরপুর, কচুক্ষেত, কাফরুল, ইসিবি চত্বর , ভাসানটেক, কল্যাণপুর, বিজয় সরণি, মেরুল বাড্ডা, মিরবাগ, মধুবাগ, পশ্চিম হাজীপাড়া, মগবাজার, ভাটারা, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, খিলগাঁও, বাসাবো, মতিঝিল ও কমলাপুর এলাকায় বেশি পানি জমে। একই সঙ্গে মহাখালী, ফার্মগেট, কাঁঠালবাগান, বনানী, গুলশান খিলক্ষেত, উত্তরা, দক্ষিণখান ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনের সড়কসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার সড়ক ডুবে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। কোথাও ছিল হাঁটু, কোথাও প্রায় কোমরসমান পানি দেখা গেছে। তবে সাপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় গতকাল সড়কে যানবাহন ও মানুষের উপস্থিতি ছিল বেশি। কিন্তু ডুবে যাওয়া সড়কের বিভিন্ন অংশে বিকল হয়ে পড়ে থাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও প্রাইভেট কার। এতে বিভিন্ন স্থানে যানজট দেখা দেয়। ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ।

মিরপুর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, সকালে বাসা থেকে বের হয়ে মনে হয়েছে রাস্তা নয়, যেন খাল পার হচ্ছি। কোথায় ম্যানহোল বা কোথায় গর্ত কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। কাপড়, জুতা সব ভিজে গেছে। প্রতিবার বর্ষায় একই কষ্ট ভোগ করতে হয়। এত উন্নয়নের কথা শোনা যায়, কিন্তু বৃষ্টি হলেই সবকিছু পানির নিচে চলে যায়।

জুলাইয়ের চেতনা এ দেশে বাস্তবায়ন করে ছাড়ব: সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা

বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসা সিএনজিচালক জাহিদুর রহমান বলেন, আসার পথে একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেছি। জমে থাকা পানিতে দু-একটি অটোরিকশা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতেও দেখেছি। বলতে গেলে পুরো ঢাকা সিটির সব সড়কেই জলাবদ্ধতা ছিল।

অথচ ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যেন না হয় সেজন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ছয় বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন সংস্কার ও ড্রেন পরিষ্কার বাবদ প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকা খরচ করে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন খাল উন্নয়ন, নর্দমা ও খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে ৯২৬ কোটি টাকা। দুই সিটির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার হাতে। বিভিন্ন সময়ে ড্রেন নির্মাণ, খাল সংস্কার, পাম্প স্টেশন স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। একই সঙ্গে ২০১৬ সালে ঢাকা ওয়াসা ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য ‘স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে ঢাকা সিটির স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ অবকাঠামোকে উন্নত করতে প্রায় ২৫০টি প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এটি আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০২০ সালে খাল ও ড্রেন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাতে একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। কিন্তু দায়িত্ব হস্তান্তরের পরও প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলাবদ্ধতার বিস্তৃতি আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়। রাজধানীর বেশির ভাগ প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার দখল এবং ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। অনেক খাল সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আবর্জনায় ভরাট। নতুন সড়ক ও ভবন নির্মাণের সময় প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের বিষয়টি উপেক্ষা করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অনেক এলাকায় ড্রেন নির্মাণ হলেও তা প্রধান খাল বা নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত নয়। ফলে ড্রেনে জমে থাকা পানি আবার রাস্তায় উপচে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, রাজধানীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে বহু সংস্থা কাজ করে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, এলজিইডি এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করলে আরেকটি সংস্থা পরে তা কেটে পাইপলাইন বসায়, আবার কোথাও ড্রেনের নকশা ও রাস্তার উচ্চতা পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই সমন্বয়হীনতার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

রূপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের বার্ষিক আনন্দভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

মাস্টারপ্ল্যান করছে ঢাকা দুই সিটি : নতুন মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে রাজধানীর সব খাল, ড্রেন, কালভার্ট, পাম্প স্টেশন এবং জলাধারের একটি সমন্বিত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোথায় কত পরিমাণ বৃষ্টির পানি জমে, কত সময়ে তা নিষ্কাশন হয়, কোন এলাকায় অতিরিক্ত পাম্প বা নতুন ড্রেন প্রয়োজন এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি দখল হওয়া খাল পুনরুদ্ধার, নতুন জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

এদিকে গতকাল টানা বৃষ্টির দিনে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা নিজ নিজ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সময় ?ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানিয়ে একসঙ্গে এ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করেছি। যেসব এলাকায় পানি জমে আছে, সেখানে দ্রুত পানি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। পানির পাম্পগুলো সচল রাখা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। তবে আকস্মিক অতিভারী বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ADVERTISEMENT

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত


সম্পাদক ও প্রকাশক : মাে:শফিকুল ইসলাম

কার্যালয় : ভাদাইল, ডিইপিজেড রোড, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা-১৩৪৯

যোগাযোগ: +৮৮০ ১৯১ ১৬৩ ০৮১০
ই-মেইল : dailyamaderkhobor2018@gmail.com

দৈনিক আমাদের খবর বাংলাদেশের একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে দৈনিক আমাদের খবর, অনলাইন নিউজ পোর্টালটি সব ধরনের খবর প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচারিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলির মধ্যে এটি একটি।

ADVERTISEMENT
×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
১৩ জুলাই ২০২৬
Trulli

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা, বাসাবাড়িতে পানি