২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন মরক্কোয় জন্ম নেওয়া মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাত। পরিসংখ্যান বলছে, এলফাতের অধীনে এখন পর্যন্ত খেলেছে এমন সব ম্যাচেই জয় পেয়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এতে শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্কের ঝড়।
এদিকে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল তার দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয় এনে দিয়ে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে চাইবেন।
কে এই ইসমাইল এলফাত?
৪৪ বছর বয়সী ইসমাইল এলফাতের জন্ম মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায়। ১৮ বছর বয়সে মার্কিন সরকারের ‘ডাইভারসিটি লটারি’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। আট বছর বয়সে মাকে হারানো এলফাত মাত্র ২০০ ডলার (প্রায় ১৫০ পাউন্ড) নিয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএল লিগ টু-এর ক্লাব অস্টিন লাইটনিংয়ের হয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে ফুটবলও খেলেছেন।
এলফাতের রেফারিংয়ে আসার পেছনের গল্পটিও ব্যতিক্রমী। ম্যাচ পরিচালনার মান নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজেই রেফারি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১১ সালে পূর্ণকালীন রেফারি হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০১২ সালে মেজর লিগ সকার (এমএলএস)-এ অভিষেক হয়।
দশ বছর আগে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় মাঠে প্রথম ভিএআর রিভিউ পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন এলফাত। ২০২৪ কোপা আমেরিকার সময় গুরুতর হাঁটুর চোটে পড়ে দুই দফা অস্ত্রোপচার করতে হয় তাকে। এক বছরেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকতে হলেও পরে তিনি আবার রেফারিংয়ে ফিরে আসেন।
কী কী অর্জন রয়েছে এলফাতের?
এলফাত ২০২০ ও ২০২২ সালে দুবার এমএলএস রেফারি অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তাকে ফিফা তিনটি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। বিশ্বকাপে তার প্রথম ম্যাচ ছিল পর্তুগালের ৩-২ ব্যবধানে ঘানাকে হারানোর লড়াই। সেই ম্যাচে ফাউলের কারণে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একটি গোল বাতিল করে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে অবশ্য রোনালদোকে একটি পেনাল্টিও দেন, যেখান থেকে গোল করেন পর্তুগিজ তারকা।
এছাড়া ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ের পর জার্সি খুলে উদযাপন করায় ক্যামেরুনের স্ট্রাইকার ভিনসেন্ট আবুবাকারকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেছিলেন তিনি। কাতার বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ ছিল জাপান ও ক্রোয়েশিয়ার শেষ ষোলোর লড়াই, যেখানে টাইব্রেকারে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া।
এছাড়া ২০১৯ সালের ক্লাব বিশ্বকাপে লিভারপুল ও মন্টেরের সেমিফাইনালও পরিচালনা করেছেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপে এলফাতের পারফরম্যান্স ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন এলফাত। নেদারল্যান্ডস ২-২ জাপান, স্পেন ১-০ উরুগুয়ে, নরওয়ে ২-১ ব্রাজিল (শেষ ষোলো)।
স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের কারণে উরুগুয়ের আগুস্তিন কানোব্বিওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। অন্যদিকে নরওয়ে-ব্রাজিল ম্যাচে একটি স্পষ্ট পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হন। পরে ভিএআরের সহায়তায় সেই ভুল সংশোধন করা হয়। এ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপে তিনি মোট আটজন খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড এবং একজনকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন।
মেসির সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ম্যাচে এলফাত ছিলেন চতুর্থ রেফারি। সেই ম্যাচেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জয় করেন লিওনেল মেসি। এরপর মেসি যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিলে এলফাত তার পাঁচটি ম্যাচ পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালের লিগস কাপ ফাইনালে ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে ম্যাচও ছিল। সেই ম্যাচে গোল করেছিলেন মেসি এবং টাইব্রেকারে ১০-৯ ব্যবধানে জিতে শিরোপা জেতে ইন্টার মায়ামি।
পরবর্তীতে এলফাতের পরিচালনায় মেসির আরও চারটি ম্যাচ খেলেছে ইন্টার মায়ামি এবং প্রতিটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে দলটি। এই পরিসংখ্যান ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কিছুটা উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার অভিযানের সময় বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বও আলোচনায় এসেছে।
‘ফকল্যান্ডস নিয়ম’ কী?
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ওঠায় ইংলিশ রেফারি মাইকেল অলিভারের বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। অলিভারকে ফাইনালের অন্যতম সম্ভাব্য রেফারি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তিনি দায়িত্ব পেলে ২০১০ সালে হাওয়ার্ড ওয়েবের পর প্রথম ইংলিশ রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করতেন। তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী কোনো রেফারি নিজের দেশের ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেন না। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ১৯৮২ সালের যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে ইংলিশ রেফারিদের আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয় না। একই কারণে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকেও ইংল্যান্ডের আরেক রেফারি অ্যান্থনি টেলরকে বাদ দেয়া হয়েছিল।












