বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন প্রবাসী লাভলু মিয়া। সে অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
লাভলু মিয়ার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিএনপি নেতা আব্দুল হাই তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং বলেন, দল চালাতে গেলে টাকা লাগে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে ২০১৩ সালের একটি হত্যা মামলায় তাকে জড়ানো হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওই মামলায় হাজিরা দিতে গেলে তাকে কারাবরণ করতে হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি জানতে পারেন, তার অনুপস্থিতিতে আব্দুল হাই তার জমিতে খুঁটি পুঁতে রাখেন এবং চাঁদার টাকা না দেয়ায় তা সরাতে নিষেধ করেন।
উল্লেখ্য, লাভলু মিয়া ২০১৩ সালে কুয়েতে প্রবাসজীবনে ছিলেন।
সংবাদ প্রকাশের দীর্ঘদিন পর আব্দুল হাই মানিকগঞ্জ জেলা আদালতে একসঙ্গে দুটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন। তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাগুলো আমলে না নিয়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বিবেচনায় খারিজ করে দেন। এর প্রায় এক মাস পর পুনরায় একই আদালতে আরেকটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওসি বরাবর নির্দেশ দিয়েছেন দেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, সাংবাদিক জসিম উদ্দিন সরকার ও সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজীব দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে এবং বাকি এক লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এদিকে মামলার ২ নম্বর সাক্ষী জিয়াউল হক জিয়া বলেন, “আমি বাজারে দোকানে বসে ছিলাম। আব্দুল হাই এসে আমাকে বলেন সাংবাদিকরা তার কাছে চাঁদা চায়। তবে আমি নিজে এমন কিছু দেখিনি, কেবল বাদীর মুখে শুনেছি।”
মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী সবুজ বলেন, “আমি চায়ের দোকানে ছিলাম। তখন আব্দুল হাই এসে একই কথা বলেন। আমি বাদীর আত্মীয় হলেও মিথ্যা সাক্ষ্য দেব না। যেটা সত্য, সেটাই আদালতে বলেছি।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ও জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ ও দৈনিক আমার বার্তা পত্রিকার সিংগাইর উপজেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান রাজীব বলেন, “দীর্ঘ ১৪ বছর সাংবাদিকতা জীবনে আমার কোনো সংবাদের বিরুদ্ধে কেউ কখনো অসত্য প্রমাণ করতে পারেনি। আমি সম্পূর্ণভাবে প্রবাসী লাভলু মিয়ার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই সংবাদটি প্রকাশ করেছি। এর আগে একই অভিযোগে দায়ের করা মামলা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। চাঁদাবাজির ঘটনার দিন আমি নিজ এলাকায় একটি সামাজিক বিয়ের অনুষ্ঠানে সারাদিন উপস্থিত ছিলাম।”
এদিকে শীর্ষনিউজ ডটকমের হেড অব মাল্টিমিডিয়া জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, কতিপয় আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ মদদে বিএনপির এক নেতা আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করেছে। মামলায় যে দিন ও সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে সময় আমি অফিসে ডিউটিতে ছিলাম—যা নথিপত্রে প্রমাণিত। এটি পরিষ্কারভাবে একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হয়রানিমূলক অপচেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, পূর্বে দৈনিক জনকণ্ঠের সিংগাইর উপজেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক হাবিবুর রহমান রাজীব বিএনপির ওই সভাপতির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের সংবাদ প্রকাশ করেন। প্রবাসী লাভলু নামের এক ব্যক্তি সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সেই চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশের প্রতিশোধ নিতেই সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এটি গণতন্ত্র ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহলের কাছে আমার জোর দাবি—এই মিথ্যা মামলা দ্রুত তদন্ত করে প্রত্যাহার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা মামলা দায়েরের ঘটনায় সিংগাইরের স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তারা অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সাংবাদিক হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।











