খন্দকার মোহাম্মাদ আলী, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলায় অবস্থানরত দুই লক্ষাধিক বহিরাগত তাঁত শ্রমিক জীবিকার তাগিদে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপক প্রচারণা চললেও শ্রমিকবান্ধব কোনো উদ্যোগ না থাকায় ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এসব শ্রমিক।
বিগত ১৭ বছর ধরে নিজেদের ইচ্ছামতো প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারা ভোটাররা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এতদিন ভোট দিতে পারিনি—সে বিষয়টি দেশের মানুষ জানে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে এলাকার কল্যাণে যিনি জননেতা হিসেবে পাশে থাকবেন এবং যার মাধ্যমে এলাকার মানুষের উন্নয়ন হবে, সেই গণতান্ত্রিক আদর্শে গড়া জননেতাকেই ভোট দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবতায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না।
কুড়িগ্রামের বাসিন্দা তাঁত শ্রমিক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ইচ্ছা থাকলেও ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে বা বাড়িতে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁত মালিকেরা একদিন ছুটি দিলেও এলাকায় গিয়ে ভোট দিয়ে আবার কাজে ফেরা অসম্ভব। এর পাশাপাশি যাতায়াত খরচও বড় সমস্যা। নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার দায়িত্ব থাকলেও রাষ্ট্র ও কর্মসংস্থানের মালিকপক্ষ সেই দায় বহন করছে না। দিনমজুরির কাজে সংসার চালানো এমনিতেই কঠিন। এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ থাকলে পরিবারের সদস্যদের অনাহারে থাকতে হবে। আমাদের মতো তাঁত শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট ও জীবন-জীবিকা নিয়ে কোনো জননেতাই ভাবেন না। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে আমাদেরই শোষণ, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার করা হয়।
উল্লাপাড়ার তাঁত শ্রমিক আব্দুল হালিম জানান, তাঁত মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের ছুটি দিতে রাজি নন। যার ইচ্ছা, সে ভোট দিতে যেতে পারে—কিন্তু দেরি হলে কাজ অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া হবে। অনেক মালিক ভোটের দিনও কারখানা খোলা রাখবেন বলে জানিয়েছেন। ফলে ভোট দিতে গেলে ফিরে এসে পুনরায় কাজ না পাওয়ার শঙ্কায় অনেক শ্রমিক এলাকায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
বেলকুচি উপজেলার তাঁত শ্রমিক আমিরুল ইসলাম জানান, বেলকুচি অঞ্চলে কুড়িগ্রাম, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, যশোর, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ শ্রমিক এসে তাঁত কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একজন শ্রমিক সপ্তাহে গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করে পরিবার চালান। এমতাবস্থায় এক সপ্তাহ কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের অনাহারে থাকতে হবে। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জননেতাদের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট কেউ দেখে না; নিজেরাই নিজেদের কষ্টের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবনপথ পার করছেন তাঁরা।
শ্রমিকরা জানান, ভোট দিতে হলে অন্তত একদিন আগে এলাকায় যেতে হয়, ভোটের পর আবার একদিন পরে কাজে ফিরতে হয়। অর্থাৎ তিন দিনের ছুটি প্রয়োজন, যা তাঁত মালিকেরা দিতে চান না। এর সঙ্গে যোগ হয় যাতায়াত ব্যয়। প্রতিদিনের আয়ের সঙ্গে সংসারের ব্যয়ের হিসাব এমনিতেই ঘারতির মুখে। এরপর কয়েক দিনের ছুটি হলে সংসার চালানোর অর্থ কোথা থেকে আসবে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া যেমন দায়িত্ব, তেমনি পরিবারের সদস্যদের অনাহারে না রাখাও একজন উপার্জনক্ষম মানুষের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থায় দিনমজুর শ্রমিকদের কথা কেউ ভাবে না। শুধু ভোটের প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করার প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। অথচ জননেতারা যদি পরিবারের মতো দায়িত্ব নিয়ে দেশ পরিচালনা করতেন, তবে শ্রমের মূল্য ও মানুষের দুঃখ-কষ্টের বিষয়টি গুরুত্ব পেত।
এ বিষয়ে একমত পোষণ করে উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী মো. শাকিল আহমেদ বলেন, হতভাগা শ্রমিকদের জীবনে রয়েছে অসংখ্য অজানা কাহিনি। রোগ, শোক ও দুঃখের মহাসংকটে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। এক প্রবীণ শ্রমিক বলেন, “দুঃখ যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কিসের।”
তাঁত শ্রমিকদের বাস্তব জীবন-জীবিকা নিয়ে আকুল কণ্ঠে ভেসে আসা যন্ত্রণার সুর প্রতিবেদকের বিবেককে নাড়া দেয়। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের চিন্তা-চেতনায় শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের প্রতিফলন ঘটবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ভোটের প্রয়োজনে শ্রমিকদের ব্যবহার নয়, জীবন-জীবিকার মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে তাদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এ অঞ্চলে অবস্থানরত বহিরাগত, অবহেলিত ও অসহায় তাঁত শ্রমিকরা।











