মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বাঘুটিয়া বাজার সংলগ্ন যমুনা নদীর চরাঞ্চল এখন যেন অবৈধ বালুখেকোদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় একটি প্রভাবশালী চক্র সশস্ত্র পাহারায় দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন—যা সরাসরি দেশের প্রচলিত আইন এবং আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিষিদ্ধ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একাধিক ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন শত শত বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পরিবহন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই চক্রের সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০”-এর একাধিক ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত স্থান ব্যতীত বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধারা ৬(খ) অনুসারে, জনবসতিপূর্ণ এলাকা, সেতু, বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিকটবর্তী এলাকা থেকে বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ধারা ১৫ অনুযায়ী, অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে; পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে।
এছাড়া, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ ও জননিরাপত্তা বিপন্ন হয় এমন এলাকায় বালু উত্তোলনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে।সশস্ত্র তৎপরতা ও প্রাণহানির নজির। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের অধিকাংশ সদস্যই অস্ত্রধারী। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।
উল্লেখ্য, অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে গত ২ এপ্রিল শিবালয় উপজেলার আলোকদিয়ার চরে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রে এর প্রতিফলন অনুপস্থিত বলে দাবি স্থানীয়দের।ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অবৈধভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীব্র ভাঙন এবং বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা যমুনার গর্ভে বিলীন হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি।
অবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার উচ্ছেদ, সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা কামনা করেছেন, যাতে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। শেষ কথা:আইন যেখানে স্পষ্ট, সেখানে প্রয়োগের অভাবই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঘুটিয়ার মানুষ এখন তাকিয়ে আছে—আইন কি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেও তার কঠোর প্রয়োগ দেখা যাবে?।













