সর্বশেষ

যমুনায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সশস্ত্র সাম্রাজ্য: কোটি টাকার বালু লুটপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের তিশোরি মৌজা সংলগ্ন যমুনা নদীতে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অবৈধ বালু উত্তোলনের এক সশস্ত্র সাম্রাজ্য। এছাড়াও দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকায় শক্তিশালী ড্রেজার ও সেকশন কাটার মেশিন বসিয়ে দিনরাত নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলা হচ্ছে। এতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ নদীতীরবর্তী শতাধিক বসতবাড়ি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ নম্বর টাওয়ারের অদূরে যমুনা নদীর বুকে বসানো হয়েছে অন্তত দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার। এসব ড্রেজারের মাধ্যমে পাইপলাইনে করে নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে সরাসরি নদীতে নোঙর করা বাল্কহেডে তোলা হচ্ছে। পরে সেসব বাল্কহেডে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে বালু।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন শতাধিক বাল্কহেডে বালু বোঝাই করে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স ও তার সহযোগী সফিক। তাদের নিয়ন্ত্রণেই যমুনা নদীর একটি বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে পুরো কার্যক্রমকে ঘিরে এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রেজারগুলোর নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জন সশস্ত্র যুবক। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের আলোচিত আন্তজেলা অপরাধী বাপ্পি ও রকি। অভিযোগ রয়েছে, এই দুজনের নেতৃত্বেই ড্রেজার পাহারা দিয়ে নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধ বালু উত্তোলনের কার্যক্রম।

নারায়ণগন্জের রূপগঞ্জে ভুলতায় গাউছিয়া মার্কেট সংলগ্ন ঢাকা-সিলেট মহাড়ক আবারো হকারদের দখলে

স্থানীয়রা জানান, বাপ্পি ও রকি একসময় নদীপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে এলাকায় কুখ্যাত ছিল। ২০২৩ সালে তারা র‍্যাব–১২ এর কাছে আত্মসমর্পণ করলেও বর্তমানে আবারও একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পাহারায় থাকা যুবকেরা মূলত মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স ও সফিকের অনুসারী। তাদের নির্দেশেই পুরো অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, জাতীয় গ্রিডের টাওয়ারের এত কাছাকাছি নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে টাওয়ারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে যে কোনো সময় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। একই সঙ্গে নদীর স্রোত ও ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় আশপাশের কয়েকশ বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

আইন অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সেতু, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া নদী ও পরিবেশ সুরক্ষায় সংবেদনশীল এলাকায় বালু উত্তোলনের ওপর উচ্চ আদালতেরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

রাজিবপুরে গোল্ডেন লাইফ একাডেমি নিয়ে বিরোধ, ব্যাংক হিসাব জালিয়াতি ও প্রধান শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ

তবে প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর এত কাছাকাছি প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে দিনের পর দিন অবৈধ বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি কোথায়? এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় একাধিকবার অভিযোগ ও মামলা হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দৌলতপুর থানা পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দৌলতপুর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাংবাদিকরা যখন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনার পরও পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে—এমন প্রশ্ন করেন, তখন দৌলতপুর থানা পুলিশের ওসির বিরুদ্ধে বালু সিন্ডিকেটের কাছে তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এতে করে অভিযানে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হয়ে পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ অবস্থায় এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ড্রেজার অপসারণ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না হলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও নদীতীরবর্তী জনপদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

দৈনিক আমাদের খবর একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নির্ভুলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
১৪ মার্চ ২০২৬
Trulli

যমুনায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সশস্ত্র সাম্রাজ্য: কোটি টাকার বালু লুটপাট