আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় গান, হাজার দর্শক মন মজাইয়া, নাচেগো সুন্দরী কমলা, প্রেমিক পুরুষ আরে রহিম মিয়া, রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া। এই গান অনেকেই শুনেছেন কিন্তু কে সেই কমলা সুন্দরী ? কোথায় ছিল কমলা সুন্দরীর বাড়ি ? এই গানের সুত্র ধরে দেখতে গিয়েছিলাম দক্ষিণ বাংলার সবচেয়ে বড় সুন্দরী কমলা রানীর দীঘি। বাকলা চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী কচুয়ার নামে পরিচিত ছিল, যার এখন কোন চিহ্ন খুজেঁ পাওয়া যায়নি। ওই রাজধানীর প্রমত্তা তেতুঁলিয়ার গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আর যেটুকু অস্তিত্ব ছিল তা এখন মানুষের দখল হয়ে গেছে । অস্তিত্ব বিলিনের পথে সুন্দরী কমলা রানীর দীঘি। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের শৌর্যবীর্যের স্মৃতি হিসেবে কমলা রানীর দীঘি।
এটা সিনেমা কিংবা রুপকথার গল্প নয় এর বাস্তবতা জানতে ও দেখতে হলে যেতে হবে পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের তেতুঁলিয়া নদীর তীরে অবস্থিত সুন্দরী কমলা রানীর দীঘি।
পুরনো লোকগাথায় জানা গেছে, রাজা জয়দেবের কোন পুত্র সন্তান ছিলনা। কমলা সুন্দরী ও বিদ্যাসুন্দরী নামে দুই মেয়ে ছিলো। কমলা সুন্দরী বিদ্যাসুন্দরী হতে ২/৩ বছরের বড়। কমলা ছিলেন বুদ্ধিমতি ও পতিতাময়ী। পিতার নির্দেশে সে রাজ্য পরিচালনা ও অস্ত্র চালনা শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরিণত বয়সে রাজা কমলাকে বাবুগঞ্জ থানার দেহেরগতি গ্রামের উষাপতির পুত্র বলভদ্র বসুর সাথে বিয়ে দেন। বলভদ্র বসু ছিলেন বিভিন্ন শাস্ত্রে সু-পন্ডিত এবং যুদ্ধ বিদ্যায় তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপে অতুলনীয়। বলভদ্র বসু দেখতে কালো ছিলেন, তাই প্রজারা তাকে কালো রাজা বলতো। বিয়ের পর কমলা স্বামীসহ কচুয়াতেই বসবাস করত। রাজা জয়দেব জামাতা ও মেয়ের জন্য রাজবাড়ী তৈরী করে দিয়েছিলেন। কালা রাজা নামের একটা বিলের নাম হয়। ওই বিলে এক সময় অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনপদ পূর্ণ ছিল। রাজা জয়দেব তার মৃত্যুর সময় বড় মেয়ে কমলাকে পরবর্তী রাজা নিযুক্ত করেছিলেন। ১৪৯০ খ্রীষ্টাব্দে কমলা সিংহাসনে আরোহন করেন। সুন্দরী কমলা রানী বাংলার প্রথম মহিলা যিনি স্বাধীন ভাবে বাকলা চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য শাসন করে। তার পূর্বে বাংলার কোন মহিলা রাজ্য শাসন করেনি। বাউফলের কালাইয়া ইউনিয়নের কমলারানীর দীঘি তার স্মৃতি বহন করছে। তার কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে মি.বেভারেজ তাকে “বাংলার রাজ কুমারী” আখ্যা দিয়েছিলেন।
বাকলা চন্দ্রদ্বীপের বা মাধব পাশার রাজাদের আদি নিবাস ছিল কালাইয়ার কচুয়া গ্রামে। তেতুঁলিয়া নদীর ভাঙ্গন ও পুর্তগীজ এবং আরাকান জলদস্যুদের অতর্কিত আক্রমন ও পাশবিক অত্যাচারের ভয়ে এ অঞ্চল ছেড়ে মাধবপাশার রাজধানী স্থাপন করেন। বর্তমানে তেতুঁলিয়া নদীটি তখন ছোট্ট একটা খাল হিসেবে পরিচিত ছিল। কচুয়া অঞ্চলের নদী-নালার পানি তখন অত্যন্ত লোনা ছিলো। তাই প্রজাদের পানি কষ্টের অভাব মোচন করার নিমিত্তে স্বামী বলভদ্র বসু ও মন্ত্রী সভার সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনার পর একটা বিরাট দীঘি খনন করার সিদ্বান্ত গৃহিত হয়। দীঘির আয়তন প্রসঙ্গে বলা হয় যে রানী কমলাদেবী খালী পায়ে একবারে যতটুকু জায়গা ঘুরে আসবেন ততটুকু জায়গা জুড়ে দীঘি খনন করা হবে। রানী কমলাদেবী একদিন ভোরে অর্চনা সেরে খালী পায়ে হাটা শুরু করলেন। পিছনে স্বামী বলভদ্র বসু ও সভাসদগণ। তারা দেখলেন রানী ক্লান্ত না হয়ে হাটছেন তো হাটছেনই, মনে হলো এ হাটার বুঝি শেষ নেই, রানী আর ও বেশী জায়গা হাটলে দীঘির আয়তন বৃদ্ধি পাবে হয়তো তখন এতবড় দীঘি খনন সম্ভব নাও হতে পারে। অথবা সম্ভব হলেও প্রজাদের অর্থের অপচয় হবে। তাই সভাসদদের পরামর্শে বলভদ্র বসু কমলার পায়ে কবুতরের রক্ত ছিটিয়ে ছিলেন। কমলারানী দেখলেন তার পা দিয়ে রক্ত ঝরছে তিনি হাটা বন্ধ করে প্রাসাদে ফিরে এলেন। জরিপে দেখা গেছে কমলারানী ৬১ কানি জমি অর্থাৎ প্রায় ১০০ একর জমি ঘুরে এসেছে।
দীঘি খননের কথা সমস্ত রাজ্যে ঘোষনা করা হলে হাজার হাজার লোক বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানী কচুয়াতে আসতে লাগলো। বর্তমানে বোরহাদ্দীন থানার দেউলার কালাভদ্র নামে এক কুমার প্রয়োজনীয় কোদাল সরবরাহের ঠিকাদার নিযুক্ত হলো। তার ২৭ পুত্র ১১৩ জন নাতী দিন রাত পরিশ্রম করে কোদাল তৈরী করলো। তৈরী করলো হাজার হাজার ঝুড়ি। মাটি কাটা শুরু হলো এবং যথাসময়ে খননকার্য শেষ হলো। এতবড় দীঘি আর এত উচুঁ প্রায় ৪০/৫০ ফুট উচুঁ পাড় কোন বাংলায় কেউ দেখেনি। দীঘি খননে তখনকার দিনে মোট ৯ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। দীঘি খনন করা হয়েছে অথচ দীঘিতে পানি উঠছেনা। দীঘির চার পাশে কত গভীর পুকুর ডোবা-নালা, খাল-বিল পানিতে ভতির্, ব্রাক্ষনদেরকে ডেকে পূজা দেয়া হলো, কাঙ্গালী ভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল কিন্তু পানি উঠতেছেনা। শুধু কমলা রানী কেন, সভাসদ ও প্রজাদের কারো চোখে ও এর জন্যে ঘুম নেই। মাসী-পিসী আর সভাসদের জল্পনা কল্পনার সীমারেখা দিগন্তের নীলিমা ছেড়ে অনেক ধূরে গিয়েছে অনেক আগেই।
একদিন কমলা রানী পালংকে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল ঠিক সে সময় কে যেন ফিস ফিস করে তার কানে কানে সাবধান করে দিয়ে গেল, যদি না সে পুকুরের ভেতর খালি পায়ে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে হেটে না আসে তা হলে কিছুতেই এক ফোটা পানি উঠবেনা এবং এটাই তার শেষ কথা। যে উদ্দেশ্যে দীঘি খনন করেছে সে উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে দিতে কিছুতেই পারে না। কমলা অতি সরল মনে একদিন সকালে পূজা অর্চনা সেরে খালি পায়ে দীঘিতে হাটা শুরু করল কমলা। দীঘির মাঝে এসে ব্রাক্ষনদের পরামর্শে গঙ্গাদেবীর পূজা দিতেই পানি ওঠা আরম্ভ করলো। চোখের নিমিষে কমলার হাটু পযর্ন্ত পানিতে ডুবে গেল কিন্তু কোমর পর্যন্ত না ওঠা অবধি কমলা ওঠবেনা বলে জিদ ধরলো। কোমর পর্যন্ত পানি উঠল কিন্তু উঠি উঠি করে কমলা আর কই উঠল?
গলা পযর্ন্ত পানি উঠলো তার চারপাশ ছেয়ে গেল পানিতে কিন্তু কমলা আর উঠলো না। ব্রাক্ষনকুল, তার স্বামী, সভাসদ ও প্রজারা এতক্ষন তামাসা দেখছিল কিন্তু হঠাৎ এক অজানা আশংকায় তাদের বুক কেঁপে উঠল। স্বামী কমলাকে উঠে আসতে বললো কিন্তু কমলা উঠতে পারছিল না বলে করুন ভাবে জানান আর আস্তে আস্তে তার স্বর ছোট হতে লাগলো। কমলার স্বামী তার শিশু পুত্র পরামানন্দের কথা স্বরন করিয়ে দিল কিন্তু কমলা জানি কেমন হয়ে গিয়েছে। শোকে দুঃকে স্বামী অধিকতর কাতর হয়ে দু,বছরের শিশু পুত্রকে দুধ খাওয়াবে কে এ প্রশ্নের উত্তরে কমলা তার শিশু পুত্রকে প্রত্যহ সকালে বিকালে সান বাধানো ঘাটের উপরে রেখে যেতে বলেছে। অনেক দিন পর্যন্ত নিয়মিত এসে কমলা শিশু পুত্রকে দুধ খাইয়ে চলে যেত।
স্বামী বিরহ যাতনা সহ্য করতে না পেরে একদিন সিড়িঁর পাশে বনের আড়ালে আত্মগোপন করে রয়েছে। কমলা নিত্য দিনের ন্যায় বাচ্ছাকে দুধ খাওয়ানোর পর যখন চলে যাবে ঠিক সে মূর্হুতে হঠাৎ তাকে ধরে ফেলতেই কমলা ঝাপটা মেরে পানিতে ঝাপিয়ে পড়লো আর ফিরেলো না। অবশ্য কমলা তার স্বামী কে ইতিপূর্বে বার বার অনুরোধ করে বলেছিল সে যেন কোন দিন তাকে স্পর্শ না করে। যদি কোন দিন সে রূপ চেষ্টা করে তবে কমলা আর কোন দিন আসবে না। তার পরে কমলা সুন্দারী দিঘির উত্তর পাড় দিয়ে তেতুঁলিয়া নদীতে চলে গেল। সেই ১৪৯০ সনে যেখান দিয়ে কমলা চলে গেছে সে খানে খালের সৃষ্টি হয়েছে। ৫১০ বছর আগের সেই খাল এখন ও রয়েছে।











