মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চর সংলগ্ন যমুনা নদীতে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারের আশপাশে, জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকৃত অঞ্চলে পুনরায় অবৈধ বালু উত্তোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী চক্র। একাধিক প্রশাসনিক অভিযানের পরও এ কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে
আজ ১১ ই এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, উক্ত এলাকায় একাধিক ড্রেজার ও নৌযানের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ কাজে জড়িত ব্যক্তিদের একটি অংশ সশস্ত্র এবং সংঘবদ্ধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে মেন্জু মেম্বার সহ আঃ রশিদ ও আঃ করিম নামের ৩ ব্যক্তি, যারা দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।
আইনগত প্রেক্ষাপট
উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা বাংলাদেশ বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একইসাথে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—বিশেষত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নিকটবর্তী এলাকায় খনন কার্যক্রম জননিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
স্থানীয়দের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান,
এলাকায় একাধিক গ্রুপ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত;
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে; সম্প্রতি একটি হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে, যা এই বালু উত্তোলন কেন্দ্রিক বিরোধের ফল;
প্রকৃত অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়, আর নিরীহ ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপানো হয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কিছু অসাধু প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে এ অবৈধ কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
প্রশাসনের অবস্থান এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা গণমাধ্যমকে জানান, ইতোমধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং অন্তত তিনটি ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন,“অবৈধ বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
বিশ্লেষণ
প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানের পরও একই স্থানে পুনরায় অবৈধ বালু উত্তোলন শুরু হওয়া নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নির্দেশ করে— আইন প্রয়োগে স্থায়িত্বের অভাব স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির দুর্বলতা সম্ভাব্য প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও নজরদারির ঘাটতি সুপারিশ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও টহল জোরদার করা; ড্রেজার ও সরঞ্জাম স্থায়ীভাবে জব্দ ও ধ্বংসের উদ্যোগ; সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তি;
জাতীয় গ্রিড অবকাঠামো রক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা;
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার।
উপসংহার
যমুনা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন কেবল পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও জননিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। প্রশাসনের বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে সমন্বিত, টেকসই এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।











