মানিকগঞ্জের শিবালয়ের যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়া চরে গত মাসের (৩ ই এপ্রিল) সংঘটিত মিরাজ হোসেন (৪০) হত্যাকাণ্ডে বহুমাত্রিক অপরাধের চিত্র একের পর অনুসন্ধানের সামনে আসছে। একটি হত্যাকাণ্ড ঘিরে ইতিমধ্যে পরপর দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে দেখা যায়,বাদী পরিবর্তন আসামি নির্ধারণে অসঙ্গতি ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধান বলে গত (৩ এপ্রিল ২০২৬) বিকেলে আলোকদিয়া চরে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ও পরবর্তীতে ড্রেজারে উঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিরাজ হোসেনকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে,হামলাটি ছিল সুপরিকল্পিত সংঘবদ্ধ। নিহত মিরাজ হোসেন পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নে বাসিন্দা। মিরাজ শিবালয় স্থানীয় বালু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মামলা দায়ের ও বাদী পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক এবং বহু অসংগতি দেখা দিয়েছে। নিহতের পরিবার এঘটনার দিনই শিবালয় থানায় (অজ্ঞাতনামা) আসামিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও তা মামলা হিসেবে গ্রহণ না করা এবং ঘটনার দুই দিন পর স্থানীয় বালুমহালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাউছার আলম খান বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে থানায় (৪ ই এপ্রিল) মামলা নং-৬ দায়ের করেন।
পরবর্তীতে নিহতের বড় ছেলে রুহুল আমিন তারেক গত (১৪ এপ্রিল) মানিকগঞ্জের আমলি আদালতে তিনজনকে ও আরো কয়েকজনকে (অজ্ঞাত) আসামি করে শিবা- সি আর মামলা নং ৮৬ দায়ের করেন। তারেক অভিযোগ করেন,আমাদের অভিযোগ গ্রহণ না করে পরিকল্পিতভাবে অন্য একজনকে বাদী করা হয়েছে,যাতে করে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থাকে। অনুসন্ধান যেসব নাম উঠে এসেছে,নিহতের পরিবার,স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী,নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের নাম ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বার বার আলোচনায়—
হাজী লিটন নিহতের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পূর্ব সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের দাবি,হত্যার আগে মিরাজকে শিবালয়ে ডেকে নেওয়া হয় এবং পূর্বের অপহরণ ঘটনার সঙ্গে তার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। শামিম ফকির,স্থানীয়ভাবে বালু ব্যবসা কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জাহাঙ্গীর শেখ ও মতিন সাধু একইভাবে ব্যবসায়িক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। নিহতের চাচাতো ভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনা-সদস্য সার্জেন্ট হাসিবুল বলেন,মিরাজকে হত্যা করা হয়েছে শিবালয়ে,অথচ মামলায় আসামি করা হয়েছে সিরাজগঞ্জের লোকজনকে। এতে পুরো ঘটনায় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে এসময় তিনি গনমাধ্যম কর্মীদের সামনে প্রশ্ন রেখে বলেন মানিকগঞ্জের লোক ছাড়া শিবালয়ের মাটিতে এসে সিরাজগঞ্জের লোকজনের হত্যাকান্ড ঘাটানো কি সম্ভব? তিনি আরোও অভিযোগ করে বলেন,হত্যাকাণ্ডের সময় নিজেদের সাথে জাহাঙ্গীর শেখ সহ আরোও কয়েকজন উপস্থিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যা পরিকল্পিত হত্যার সন্দেহ আরোও জোরালো করছে।
স্থায়ীয় বালু মহালের ঠিকাদার কাউছার আলম খান মামলার বর্তমান বাদী;যদিও তিনি নিজেই নিহতের পরিবারের কাছে দাবি করেছেন যে,তিনি স্বেচ্ছায় বাদী হননি বরং প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের কারণে বাধ্য হয়েছেন (পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী)।
উল্লেখ্য,উপরোক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।
অনুসন্ধান বলে অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ:নিহতের পরিবারের ভাষ্যমতে, হত্যার পূর্বে মিরাজ হোসেনকে নদীপথে অপহরণ করে ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনায়ও“হাজী লিটন”-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে,নিহত ব্যক্তি প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার টাকা হারে একটি সশস্ত্র চক্রকে চাঁদা প্রদান করতেন এবং চাঁদা প্রদান বন্ধ করার পর থেকেই তার ওপর হুমকি বৃদ্ধি পায়। এতে করে মিরাজ বেশ কিছুদিন আতঙ্কে ছিলেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে,কেন পরিবারের দায়ের করা অজ্ঞাতনামা অভিযোগ এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি কেন? এমন একজনকে বাদী করা হলো,যিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী নন? আসামিদের নাম নির্ধারণে কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছিল কি না? পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে,তদন্ত কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন।
এসকল বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহররম আলী এই প্রতিবেদককে জানান তদন্ত বহুমুখীভাবে পরিচালিত হচ্ছে ও সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। বাদী নির্বাচন প্রসঙ্গে পুলিশের দাবি—তিনি স্থানীয়ভাবে বালু ব্যবসা সম্পর্কে অবগত এবং তদন্তে সহায়ক হবেন।
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী:ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে,যার পেছনে আর্থিক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব কাজ করেছে।
মামলা দায়ের প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি তদন্তকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মিরাজ হোসেন হত্যা মামলা এখন কেবল একটি অপরাধ তদন্ত নয়,এটি আইনের শাসন,প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভুক্তভোগী পরিবারের একমাত্র দাবি,নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা হোক,এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়,এদিকে লক্ষ্য রেখেই তদন্তের কার্যক্রম এগিয়ে যাবে এটাই ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা।











