মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়া চরে রাষ্ট্রীয় আইন, আদালতের নির্দেশনা এবং প্রশাসনিক অভিযানকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার, জনবসতি ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমির অতি নিকটবর্তী এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এতে জাতীয় গ্রিড, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুক্রবার (১০জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন এলাকায় অন্তত ৯টি ড্রেজারের মাধ্যমে অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন চলছে। নদীতে অবস্থানরত কয়েকটি নৌকায় থাকা ব্যক্তিদের ড্রেজারগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের উপস্থিতির খবর পেলেই ড্রেজার সরিয়ে ফেলা বা সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে অধিকাংশ অভিযান স্থায়ী ফল দিচ্ছে না।
হাইকোর্টের নির্দেশ কি কাগজেই সীমাবদ্ধ? ২০২৫ সালে মহামান্য হাইকোর্ট পদ্মা, যমুনা সহ দেশের নদ-নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন। আদালত স্পষ্টভাবে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, নদীতীর ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো বালুমহাল ঘোষণা বা বালু উত্তোলন করা যাবে না এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
একই বছরে আরেক আদেশে মহামান্য হাইকোর্ট পদ্মা, যমুনাসহ সারা দেশে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এছাড়া সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, মহাসড়ক, রেলপথ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ—এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েও আদালত নির্দেশনা প্রদান করেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন,আদালতের এমন স্পষ্ট নির্দেশনার পরও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের অদূরে কীভাবে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে পারে? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া অথবা নিষিদ্ধ এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ।
একই আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, নৌযান ও অন্যান্য সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও আইনে রয়েছে, যা ২০২৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ পানি আইন,২০১৩, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন,১৯৯৫-এর কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মত দেন আইন বিশেষজ্ঞরা। অভিযান হচ্ছে,কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না বালু লুট স্থানীয়দের অভিযোগ,একাধিক লিখিত আবেদন,মানববন্ধন,প্রশাসনিক অভিযান এবং জনস্বার্থে ধারাবাহিক আন্দোলনের পরও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। বরং সংঘবদ্ধ চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ,অনেক সময় অভিযানের আগেই তথ্য সংশ্লিষ্ট চক্রের কাছে পৌঁছে যায়,যার ফলে ড্রেজার সরিয়ে ফেলা হয় এবং অভিযান ব্যর্থ হয়।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়,শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রাণী কর্মকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ, নদী ও জনস্বার্থ রক্ষায় একাধিকবার ঝুঁকি নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। কিন্তু ধারাবাহিক অভিযানের পরও অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রাণী কর্মকার বলেন, “গত ৬ জুলাই পরিচালিত মোবাইল কোর্ট অভিযানে একটি ড্রেজারকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে স্থানীয় নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডকে আরও কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
অস্ত্রধারী পাহারা ও সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ,ড্রেজার পাহারায় নিয়োজিত কিছু ব্যক্তি অস্ত্রধারী এবং তারা অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রের হয়ে কাজ করছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের জেরে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে প্রথমে অনৈতিক আর্থিক প্রস্তাব এবং পরে বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকদের দাবি,অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যরা সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে,বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
যোগসাজশের অভিযোগ,মেলেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থার বক্তব্য,স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রের সঙ্গে কিছু দায়িত্বশীল সংস্থার সদস্যদের যোগসাজশ থাকতে পারে। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপারের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া পাটুরিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি স্থানীয়দের দাবি,জেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড,পরিবেশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বয়ে অবিলম্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অবৈধ ড্রেজার জব্দ,জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা,অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং জাতীয় গ্রিডসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।













