মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়া চরে জনবসতি, কৃষিজমি এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর অতি নিকটবর্তী এলাকায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০-এর সুস্পষ্ট বিধান উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি,একাধিক লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন,প্রশাসনিক অভিযান ও জনস্বার্থে আন্দোলনের পরও একটি প্রভাবশালী চক্র ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে,যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই)সরেজমিনে দেখা যায়,আলোকদিয়া চর এলাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন জনবসতি ও বসতবাড়ির পাশ থেকে প্রায় ৯টি ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন চলছে। একই সময়ে নদীতে অবস্থানরত তিনটি নৌকায় কয়েকজন যুবককে ড্রেজারগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এদিকে একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি,শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রাণী কর্মকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ, নদী এবং জনস্বার্থ রক্ষায় একাধিকবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। তবে প্রশাসনিক অভিযানের পরও অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ,প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার আগেই কোনো না কোনোভাবে তথ্য সংশ্লিষ্ট চক্রের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অভিযুক্তরা আগাম ড্রেজার সরিয়ে নেয় বা আত্মগোপন করে। এতে যেমন সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযান পরিচালনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি আইন প্রয়োগের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০,মোবাইল কোর্ট আইন,২০০৯,বাংলাদেশ পানি আইন,২০১৩, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন,১৯৯৫-এর সমন্বিত ও কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া কিংবা নিষিদ্ধ এলাকায় বালু বা মাটি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জনস্বার্থ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নদী রক্ষার স্বার্থে জেলা প্রশাসক যে কোনো এলাকা বালু উত্তোলনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। এছাড়া আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে।
একই সঙ্গে অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালুবাহী যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও আইনে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০২৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত বিধান আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ড্রেজার পাহারায় নিয়োজিত কিছু ব্যক্তি অস্ত্রধারী এবং তাদের অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্র ভাড়া করে এনেছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। এলাকাবাসী জানান, বসতবাড়ি, ফসলি জমি এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষার দাবিতে তারা ইতোমধ্যে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
পাশাপাশি সরকারপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একাধিক মানববন্ধনও করেছেন। তাদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, “প্রশাসনের নীরবতা বা দুর্বল প্রয়োগের সুযোগে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বৃহত্তর আন্দোলন এবং সরকারপ্রধানের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রাণী কর্মকার গণমাধ্যমকে জানান,৬ জুলাই ২০২৬ পরিচালিত মোবাইল কোর্ট অভিযানে একটি ড্রেজারকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। তিনি বলেন,অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে স্থানীয় নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডকে আরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যদিকে,কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন,অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের সঙ্গে কিছু দায়িত্বশীল সংস্থার সদস্যদের যোগসাজশ থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া পাটুরিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরও বুধবার সকাল পর্যন্ত বন্ধ পাওয়া যায়।
ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন,যদি প্রশাসনিক নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের পাশেই কীভাবে প্রকাশ্যে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। জনস্বার্থে স্থানীয়রা অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান, অবৈধ ড্রেজার জব্দ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া নদী,পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না।














