মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম আলোকদিয়া চর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান ও জিরো টলারেন্স নীতির মধ্যেও নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি বালু উত্তোলনকারী চক্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতায় অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলেও যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে এখনও সুযোগ বুঝে সক্রিয় রয়েছে চক্রটি। নদীপথে পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকলে তারা আবারও ড্রেজার বসিয়ে সরকারি সম্পদ লুটে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বাংলাদেশ নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বলেন,অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসন যে ভূমিকা পালন করছে, তা প্রশংসনীয়। তবে এত বড় একটি নদীপথে অবৈধ বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নৌপুলিশকে সমন্বিতভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে।
তাদের মতে,বিশেষ করে দুর্গম যমুনা নদীপথে অবৈধ ড্রেজার শনাক্ত ও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণে নৌপুলিশের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন স্থলভাগ থেকে অভিযান পরিচালনা করলেও নদীপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ইউএনও মনিষা রানী কর্মকারের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন,অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকারের সাহসী ও ধারাবাহিক ভূমিকার প্রশংসা করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তারা জানান, দুর্গম চরাঞ্চল এবং উত্তাল যমুনার ঝুঁকি উপেক্ষা করে ইউএনও বিভিন্ন সময় আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করছেন। নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য,অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কাছে বর্তমানে শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান একটি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকলে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সরেজমিনে ভোরে ড্রেজারে বালু উত্তোলন
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সরেজমিনে আলোকদিয়া চর এলাকায় গিয়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন নদীর অংশে বেশ কয়েকটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ,এভাবে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীরভাঙন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নৌপুলিশের ভূমিকা আরও জোরদারের দাবি,অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি নৌপুলিশের আরও কার্যকর ভূমিকা চান স্থানীয়রা।
নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বলেন, প্রশাসনের পক্ষে প্রতিটি মুহূর্তে যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে নজরদারি করা সম্ভব নয়। তাই নদীপথে নিয়মিত টহল,অবৈধ ড্রেজার শনাক্তকরণ, জব্দ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে নৌপুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে।
তাদের অভিযোগ,অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ, হামলা, হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি নদীপথকে নিরাপদ রাখতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।
প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার গণমাধ্যমকে বলেন,মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় শিবালয় উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কাউকেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান,যমুনার নৌপথে অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে নৌপুলিশকে আরও জোরদার টহলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন দৃঢ় অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মূলহোতা, ড্রেজার মালিক ও সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই চক্রকে স্থায়ীভাবে দমন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যমুনা কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। নদীর বুক চিরে অবৈধভাবে বালু তুলে যারা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ও কার্যকর অভিযান এখন সময়ের দাবি।
















