বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আত্মদানকারীদের ত্যাগ জাতির জন্য প্রেরণার উৎস। তাদের আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এগিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা নিয়ে শহীদ জেহাদসহ অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছিলেন।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সাহসী বীর শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শহীদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সাবেক সংসদ সদস্য নাজিমুদ্দিন আলম, হাবিবুর রহমান হাবিব, খন্দকার লুৎফর রহমান।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন সভার সঞ্চালনা করেন। aরুহুল কবির রিজভী বলেন, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসে নাজির উদ্দিন জেহাদ স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে প্রাণ হারান। তার আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নতুন প্রেরণা জোগায়।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। ওই আন্দোলনে শহীদ জেহাদ, ড. মিলনসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা ও আন্দোলনকর্মী জীবন উৎসর্গ করেন। জাফর, জয়নাল, হারুন ও মোজাম্মেলসহ বিভিন্ন সময়ে আত্মদানকারী ছাত্রনেতাদের ত্যাগ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের পরও দেশে বারবার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে শহীদদের আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের আন্দোলন-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রেরণা জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতার অংশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতা, শারীরিক অসুস্থতা ও কারাবাসের মধ্যেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানও একই ধারায় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগের যে ইতিহাস রয়েছে, তা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। শহীদ সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মুগ্ধ ও আহনাফসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অতীতের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা চুরির ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অনিয়ম ও অর্থ পাচারের সঙ্গে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের দোসররা জড়িত ছিল।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাদের দোসররা রয়ে গেছে। এসব ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, অতীতে একজন শিক্ষামন্ত্রী ‘সহনীয় পর্যায়ে দুর্নীতি করা যাবে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ ছাড়া হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের একজন পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনে এ ধরনের মনোভাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলে জনগণ তা সমর্থন করবে।
সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং বন্ধ কারখানাগুলো সচল করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। সরকারের উন্নয়ন, উৎপাদন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের পুনরুত্থান প্রতিহত করা জরুরি। অপতৎপরতা রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছে। ঈদ, পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে একে অপরের অংশগ্রহণ দেশের ঐতিহ্যের অংশ।
তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।













