সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব্যুরো:
প্রতিবছর ফেব্র“য়ারী-মার্চের দিকে হালদার সাথে সংযুক্ত অন্যান্য নদী থেকে বড় বড় রুই জাতীয় মাছগুলো এ নদীতে আসে ডিম ছাড়ার জন্য এবং অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তবে কিছু মাছ স্থানীয়ভাবে এই নদীতে অবস্থান করে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় অনুকুল পরিবেশে হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। এই সময়কে স্থানীয় ভাষায় “জো” বলে। এই “জো”র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হতে হবে। এই সময় প্রচন্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হবে, এই বৃষ্টিপাত শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে হলে হবে না একই সাথে নদীর উজানের পাহাড়ী অঞ্চলেও প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে হবে, ফলে নদী পথে পাহাড়ী ঢল নামবে। পাহাড়ী ঢলের পানি খুবই ঘোলা হবে এবং খরশ্রোতা হয়ে ফেনাসহ হালদা নদী দিয়ে প্রবাহিত হবে। এতে নদীর পানির কিছু ভৌত রাসায়নিক পরিবর্তন হবে যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয় হলে পরে সর্বশেষ বৈশিষ্ট নদীর জোয়ার অথবা ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পূর্ণ জোয়ারের শেষে পানি যখন স্থির হয় অথবা ভাটার শেষ সময়ে পানি যখন প্রায় স্থির হয় তখন মাছ ডিম ছেড়ে দেয়।
তবে চূড়ান্তভাবে ডিম ছাড়ার আগে মাছ পরীক্ষামূলকভাবে অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে। একে স্থানীয় ভাষায় নমুনা বলে। এই নমুনা ছাড়ার মাধ্যমে মাছ তাদের নতুন বংশধরদের জন্য নদীর পরিবেশ নিরাপদ এবং অনুকুল কিনা তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। অনুকুল পরিবেশ নিশ্চিত হলে পরে মাছ চূড়ান্তভাবে ডিম ছাড়ে। নমুনা ছাড়ে বিশেষ করে জোয়ারের মাঝামাঝি অবস্থায়। নমুনা পাওয়া গেলে স্থানীয় লোকজন নৌকা, জাল ও অন্যান্য ডিম ধরার সরঞ্জাম নিয়ে ডিম সংগ্রহের জন্য নদীতে অবস্থান নেয়। অপরূপ সে প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যিই দেখার মতো।
হালদার ডিম সংগ্রহের কৌশল সম্পূর্ণ স্থানীয়। তাদের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিম সংগ্রহ করে থাকে। এই প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে হালদায় মাছ যে পরিমান ডিম দেয় তার মাত্র ২০-২৫% সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এই পদ্ধতির সাথে কিছু প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারনার সমন্বয় করতে পারলে অধিক পরিমাণ ডিম সংগ্রহ সম্ভব হবে। এই প্রচলিত পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন ১টি কাঠের নৌকা, ২-৩ জন মানুষ, ১টি ডিম ধরার জাল, ২টি নোঙ্গর, ২টি বড় বাঁশ, ২টি বড় প্লাষ্টিক বালতি ইত্যাদি। সংগৃহিত ডিম নৌকার মধ্যবর্তী খোলের মধ্যে দুইপার্শ্বে কাঠ ও মাটি দিয়ে বিশেষ ভাবে তৈরি ১টি চার কোণা আকৃতির প্রকোষ্ঠ তৈরী করে একে স্থানীয় ভাবে ”গুদি” বলে। প্রতি গুদিতে ২৫ থেকে ৩০ বালতি (১০/১২ লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন) ডিম রাখতে পারে এই গুদি বা প্রকোষ্ঠের ভিতর ১টি সুতির মার্কিন কাপড় বিছানো থাকে। এই কাপড়ের উপর ডিম রাখে। এই কাপড় দেয়ার ফলে ডিমের পানির পরিবর্তন ও কুয়াতে পরিবহণে সুবিধা হয়। নৌকার প্রকোষ্ঠে থাকা অবস্থায় ডিম ও পানির পরিমাণ হবে সমান। প্রতি ঘন্টা পর পর পানি পরিবর্তন করতে হবে, না হলে অক্সিজেন স্বল্পতা এবং পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডিম নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহের অসুবিধা হচ্ছে- প্রথমত: নদী থেকে খুবই কম পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করতে পারে (২০-২৫%)। অবশিষ্ট ডিম ৭/৮ ঘন্টার মধ্যেই অর্থাৎ রেণু ফোটার আগেই সমুদ্রের লোনা পানিতে চলে যায়। ফলে সব ডিম নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত: একটি নৌকার জন্য যে পরিমাণ ব্যয় হয় (নৌকা বাবদ ২৫১০০/-, শ্রমিক বাবত ১১,০০০/-) তাতে জেলেদের চড়া সুদে কর্জ নিতে হয়। প্রতি নৌকার সংগৃহিত ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের মাধ্যমে যে আয় হয়, তাতে খরচের সাথে সামঞ্জস্য থাকে না। ফলে দরিদ্র জেলেরা ডিম সংগ্রহের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। চড়া সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িত হচ্ছে। তাই ডিম সংগ্রহকারীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তৃতীয়ত: ডিম সংগ্রহের কাজ অতিরিক্ত শ্রম নির্ভর। বিগত ৬-৭ বছর ধরে ডিমের পরিমাণ খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রতি নৌকার জন্য ২/৩ জন লোক ছাড়া ডিম সংগ্রহ সম্ভব নয়। তাদের এই শ্রমের বিনিময়ে যে পরিমাণ ডিম আহরিত হয় তা শ্রমের তুলনায় অতি নগন্য বলা চলে।
নদী থেকে সংগৃহিত ডিম সম্পূর্ণ স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির গর্তে ফুটানো হয়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে নদীর পাড়ে চার কোনা বিশিষ্ট মাটির গর্ত তৈরী করা হয়। এই গর্তের আকার স্থান ভেদে বিভিন্ন সাইজের হয়ে থাকে। সাধারণত: ৮-১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ৬-১০ ফুট প্রস্থের এবং ৩-৪ ফুট গভীরতার হয়ে থাকে। এই মাটির গর্ত গুলোতে মশারীর কাপড়ের উপর ডিম রেখে ৪ দিন পর্যন্ত পরিচর্যার মাধ্যমে রেণু উৎপাদন করা হয়। ৪ দিন অর্থাৎ ৯৬ ঘন্টা পর এই রেণুগুলো বিক্রয় করা হয়। ২০০৯ সালে ৪ দিন বয়সের প্রতি কেজি রেণূর বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৬০-৬৫ হাজার টাকা।
( পর্ব ৩ )











