সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব্যুরো
হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার কারণ:
হালদা নদী এবং নদীর পানির কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য এখানে মাছ ডিম ছাড়তে আসে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে ভিন্নতর। এ বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক। ভৌতিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর অক্সবো বাঁক, অনেকগুলো নিপতিত পাহাড়ি ঝর্ণা বা ছড়া, প্রতিটি পতিত ছড়ার উজানে এক বা একাধিক বিল, নদীর গভীরতা, কম তাপমাত্রা, তীব্র খরস্রোত এবং অতি ঘোলাত্ব। রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম কনডাক্টটিভিটি, সহনশীল দ্রবীভুত অক্সিজেন, পিএইচ., কম হার্ডনেস এবং কম এলক্যালাইনিটি ইত্যাদি। জৈবিক কারণগুলো হচ্ছে বর্ষার সময় প্রথম বর্ষণের পর বিল থাকার কারণে এবং দুকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে নদীর পানিতে প্রচুর জৈব উপাদানের মিশ্রণের ফলে পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে যা প্রজননপূর্ব গোনাডের পরিপক্কতায় সাহায্য করে। অনেকগুলো পাহাড়ি ঝর্ণা বিধৌত পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো এবং মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকার ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণুর সৃষ্টি হয় (ফাইটোপ্লাংকটন, জুপ্লাংকটন ও বেনথোস)। উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছকে বর্ষাকালে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে স¤পূর্ণভাবে আলাদা।
ডিম ছাড়ার স্থান:
হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজনন স্থান হচ্ছে নদীর বিশেষ ধরনের বাঁক। এই বাঁকগুলোকে অক্সবো বাঁক বলে। নদীর এসব বাঁক পানির উলট-পালট, পানির স্রোতের গতিধারা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক অনুঘটক উৎপন্ন করে মাছের প্রজননের বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং ডিম নিষিক্ত করতে সহায়তা করে। তা ছাড়া এই বাঁকগুলোতে পানির ঘুর্ণনের কারণে প্রাকৃতিকভাবে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়, যাকে কুম বা কূয়া বলে। প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট এসব কুম বা কূয়া হালদা নদীতে মাছের প্রজনন ও প্রজননকালীন সময়ে বিভিন্ন নদী থেকে এসে ব্র“ড মাছ অবস্থান করার বিশেষ স্থান। মূলত বাঁকগুলো হালদা নদীতে মাছের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এই নদীকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের খ্যাতি এনে দিয়েছে। আর এজন্য হালদা নদী দেশের মৎস্য খনি হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
উনবিংশ শতকের গোড়া থেকে প্রায় ১০০ বছরে হালদা নদীর এগারটি বাঁক পর্যায়ক্রমে কেটে দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে হালদার ভাটি এলাকায় আটটি, উজান এলাকায় তিনটি বাঁক কেটে দেয়া হয়েছে। এই বাঁকগুলো কেটে দেয়ায় প্রায় ১২৩ কি.মি. নদীর দৈর্ঘ্য ২৫ কি.মি. কমে ৯৮ কি.মি. হয়েছে। হালদার ভাটি এলাকার (হাটহাজারী ও রাউজানের অংশ) অক্সবো বাঁকগুলো রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।
উনবিংশ শতকের শেষে এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে হালদা নদীতে মাছ বেশ কয়েকটি বাঁকে ডিম ছাড়তো। প্রথম বাঁক কাটা হয় বর্তমান মকদাইর খালের মুখে ছৈয়দ্দার চর বাঁক ১৯০৫-১৯১০ সালের দিকে। পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামের শেয়ানঘাট (øানঘাট) নামক স্থানটি পুরানো এ হালদার সাক্ষ্য বহন করছে। এখানে একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় øান করতো এবং মেলা বসতো। বাঁক কাটার পর এই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন øান ও মেলা কোনটাই হয় না।
দ্বিতীয় বাঁক কাটা হয় পোড়া খালির মুখে মাছুয়াঘোনা অক্সবো বাঁক। এখানেও মাছ ডিম ছাড়তো, ১৯২৮ সালে এই বাঁকটি কেটে দেয়ার কারণে মাছ পরবর্তী বছর গুলোতে বাড়িঘোনা বাঁকে ডিম ছাড়তো, ১৯৪৮ সালে এই বাঁকটি কেটে দেয়ার কারণে এখানের মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে ১৯৪৮ সালে এই বাঁক কাটা নিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রায় ১২ জন লোক নিহত হয়েছেন। এরপর মাছ আরো উজানে অঙ্কুরীঘোনা নামক অক্সবো বাঁকটি বেছে নেয় ডিম ছাড়ার জন্য, এই বাঁকটিও ১৯৬৪ সালে কেটে দেয়া হয়, একই বছর হাটহাজারীর পূর্ব মেখল এবং ছিপাতলির মধ্যবর্তী স্থানেও একটি বাঁক কেটে দেয়া হয়। এরপর মাছ ডিম দেয় সোনাইরচর বাঁকে, এটি ১৯৮৮-৯০ সালে কেটে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মাছ কাগতিয়ার বাঁককে ডিম দেয়ার স্থান হিসাবে বেছে নেয়। বিগত বছরগুলোতে এই বাঁকে মাছ ডিম ছাড়ত। ফটিকছড়ি উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামে একটি বাঁক কেটে দেয়া হয়েছে, তবে এই বাঁক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। সর্বশেষ ২০০২ সালে গড়দুয়ারার কাগতিয়ার বাঁকটি ১০ ফুট প্রশস্থ করে কেটে সোজা করে দেয়া হয়। এই বাঁকটি কাটার মাধ্যমে হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজননের সর্বশেষ অক্সবো বাঁকটি ধ্বংস করে দেয়া হলো। এটিই হচ্ছে হালদা নদীর রুই জাতীয় মাছের সর্বশেষ প্রজনন স্থান। এই অক্সবো বাঁকটি কেটে সোজা করে দেওয়ায় বিশেষজ্ঞরা আশংকা করেছিল এই প্রজনন ক্ষেত্রের অস্তিত্ব থাকবে কিনা। এর চূড়ান্ত রূপ নিল ২০০৮ সালে। কারণ নতুন কর্তনকৃত খালটি ক্রমশ চওড়া হয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করার মাধ্যমে গড়দুয়ারা প্রজনন ক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। এতে মাছ ডিম দেয়ার উপযুক্ত স্থান না পেয়ে নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে (খাগতিয়ার মুখ থেকে নাপিতের ঘাট) বিক্ষিপ্ত ভাবে ডিম দেয়। এতে ডিম সংগ্রহকারীরা প্রজননের সুুুনির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করতে না পেরে বিক্ষিপ্তভাবে ডিম সংগ্রহ করে। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। যার কারণে স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারীরা আর্থিকভাবে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
( পর্ব ২ )











