হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আলম শেখ–প্রিন্স চক্রের সশস্ত্র ড্রেজিং বিদ্যুৎ টাওয়ারের গোড়া কেটে হাজারো মানুষের বসতভিটা এখন ধ্বংসের মুখে। যমুনা নদীকে গিলে খাচ্ছে বালু মাফিয়াফরিদপুর–মানিকগঞ্জে প্রভাবশালীদের নামে ভয়ংকর অবৈধ ড্রেজিং এক্সপোজ মহামান্য হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করে যমুনা নদীতে চলছে সংঘবদ্ধ বালু সন্ত্রাস। ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার একাধিক এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্র সশস্ত্র পাহারায় অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে নদী খননের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের জীবন ও সম্পদকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ফরিদপুরে আলম শেখ চক্রের দাপট
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার সিএন্ডবি ঘাট, ডিগ্রির চর ও কলাবাগান এলাকায় আদালতের নিষিদ্ধ ঘোষিত চরাঞ্চলে একাধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার স্থাপন করে নিয়মিত বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, আলম শেখ নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি চক্র এই অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, সশস্ত্র লোকজন দিয়ে এলাকা ঘিরে রেখে রাতের বেলা ট্রাক ও নৌযানে করে বালু পাচার করা হয়। এতে নদীর তীর ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,এই ড্রেজিং বন্ধ না হলে কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারাবে। আমরা কার্যত উদ্বাস্তু হওয়ার পথে।”মানিকগঞ্জে প্রিন্স বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার চর বাঘুটিয়া ও শিবালয় উপজেলার তেওতা এলাকায় আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্সের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী প্রশাসনের নজর এড়িয়ে রাতের আঁধারে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ড্রেজিং চলছে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের একেবারে গোড়া থেকে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও জাতীয় অবকাঠামো ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বাঘুটিয়া ইউনিয়নের এক ওয়ার্ড মেম্বার জানান, “প্রিন্স বাহিনীর এই বালু উত্তোলনের কারণে কয়েক হাজার বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। এটা সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে খেলা।”কোন কোন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে একাধিক গুরুতর আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে—সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ: নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার লঙ্ঘন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন,১৯৯৫: পরিবেশ ধ্বংস ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০: নিষিদ্ধ এলাকায় বালু উত্তোলন উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য: সরাসরি আদালত অবমাননা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও বিদ্যুৎ টাওয়ারের নিচে ড্রেজিং: ফৌজদারি অপরাধ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের অভিযোগ, আলম শেখ ও মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্সের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান ছাড়া কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। অবৈধ ড্রেজার জব্দ বা মূলহোতাদের গ্রেপ্তারের নজির নেই বললেই চলে।
এ বিষয়ে ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের কাছে জানতে চাইলে তারা জনবল সংকট ও নির্বাচন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তদন্তের আশ্বাস দেন। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—
এই আশ্বাস কি আবারও বালু সন্ত্রাসীদের জন্য সময় কেনার কৌশল?মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে যমুনা পাড় পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, অবিলম্বে আলম শেখ ও প্রিন্স চক্রের অবৈধ ড্রেজার অপসারণ, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে যমুনা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভয়াবহ নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনের শাসন কার্যকর হবে, নাকি যমুনা নদী বালু মাফিয়াদের হাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে?











