ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র পাহারায় অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বালু মাফিয়া হিসেবে পরিচিত আলম শেখের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ২০টিরও বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার বসিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করছে।
এ কর্মকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে,সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার সিএন্ডবি ঘাট, ডিগ্রির চর, ধলার মোড় সংলগ্ন পদ্মা নদীর অংশ এবং রাজবাড়ী জেলার পদ্মার কলাবাগান এলাকা, গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়ন সংলগ্ন পদ্মা নদীর বিভিন্ন চ্যানেল, উজানচর ইউনিয়নের চরাঞ্চল, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মা নদী, দৌলতদিয়া পোড়াভিটা চর এলাকা এবং দৌলতদিয়া ঘাট সংলগ্ন নদী এলাকায় নিয়মিতভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, আলম শেখের নেতৃত্বাধীন এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে নদীর এসব এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছে। প্রায় ২০টিরও বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজারের মাধ্যমে দিন-রাত অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজারগুলোকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র লোকজন পাহারা দিচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যরা অস্ত্রধারী হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারছেন না। নিজেদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি রক্ষার জন্য তারা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সাহস পাচ্ছেন না। ফলে পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলের কয়েক হাজার বসতবাড়ি, কৃষিজমি, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীভাঙনের চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার ডিগ্রির চর, সিএন্ডবি ঘাট, গোয়ালন্দ ও দৌলতদিয়া এলাকায় পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকার কিছু অংশে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ওপর মহামান্য হাইকোর্টের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করেই অব্যাহত রয়েছে এ অবৈধ কার্যক্রম।
অনুসন্ধানকালে গণমাধ্যমকর্মীদের বহনকারী ট্রলারের চালক সতর্ক করে বলেন, “সাবধানে থাকবেন। যদি তারা টের পায় আপনারা সাংবাদিক, তাহলে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না।” এ সময় দেখা যায়, একটি ট্রলারে প্রায় ২০ জনের মতো যুবক অস্ত্র হাতে ড্রেজারগুলো পাহারা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দ্রুত নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নদীতীরবর্তী বসতি ও অবকাঠামো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সরকারি অনুমতি ছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের আওতায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা, ড্রেজার জব্দ এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার জেলা প্রশাসকরা গণমাধ্যমকে জানান, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি নজরদারিতে রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান ছাড়া পদ্মা নদীতে চলমান অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নদী ও জনপদ রক্ষার দাবি জানিয়েছেন।











