মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের যমুনা নদীর আলোকদিয়া চর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপের অভাবে একটি প্রভাবশালী বালু মাফিয়া চক্র উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার ব্যবহার করে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে বুধবার (১০ জুন) সকাল ৯টার দিকে দেখা যায়, আলোকদিয়া চর এলাকায় জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আশপাশ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে যমুনা নদীতে অন্তত পাঁচটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক বাল্কহেডে এসব বালু পরিবহন করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে,আ.রশিদ,আ.করিম, জুলহাস,আক্তার হোসেন ও বাবুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সশস্ত্র যুবকদের পাহারায় এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহলের নাম ব্যবহার করে অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে স্থানীয়দের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে কথা বললে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হবে এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
স্থানীয়দের মতে,অপরিকল্পিত ও অনুমোদনবিহীন বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক হাজার বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকা যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ,এলাকায় কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের উপস্থিতি থাকলেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে বালু ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বিশেষজ্ঞদের মতে,জনবসতি,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং নদী তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নিকট থেকে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত স্থান ও শর্ত ব্যতীত বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা,ড্রেজার জব্দ, বাল্কহেড আটকসহ ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। এছাড়া আইন অনুযায়ী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ,পরিবেশ কৃষি জমি বসতবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। ফলে আলোকদিয়া চর এলাকায় পরিচালিত বালু উত্তোলন কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন,
“রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার নিকটবর্তী যমুনা নদী থেকে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে।”তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নিয়মিত অভিযান চলমান থাকলে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে কীভাবে শত শত বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পরিবহন করা হচ্ছে? এলাকাবাসী দ্রুত অবৈধ ড্রেজার অপসারণ, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নদী তীরবর্তী জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।














