মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ আলোকদিয়া চরাঞ্চল বর্তমানে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জনপদে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অবৈধ বালু উত্তোলন,সশস্ত্র চাঁদাবাজি,নদীপথে আধিপত্য বিস্তার ও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে চরাঞ্চলে এলাকাজুড়ে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সম্প্রতি আলোকদিয়া চর এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে এমন তথ্য উঠে এসেছে ও একাধিক গুরুতর অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা দাবি করেন,যমুনা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সহযোগীদের মাধ্যমে নদীপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন নৌযান ও বাল্কহেড থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,চরাঞ্চলের একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিকটবর্তী নদী অংশে পাঁচটিরও বেশি শক্তিশালী সেকশন কাটার ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করছে। অভিযোগ রয়েছে,এসব কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বাধা বা নজরদারি কার্যত দৃশ্যমান নয়।
এলাকাবাসী জানান,অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে শত শত পরিবারের বসতভিটা, ফসলি জমি এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নিজেদের জমি ও বসতবাড়ি রক্ষার দাবিতে স্থানীয়রা একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় তারা হতাশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ,নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০ অনুযায়ী জনবসতিপূর্ণ এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং নির্ধারিত সুরক্ষিত সীমার ভেতরে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই চলছে অবৈধ বালু ব্যবসা। এদিকে,১৫ জুন ২০২৬ তারিখে আলোকদিয়া চর এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানকালে নদীতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি ড্রেজার সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়। এসব ড্রেজার থেকে শতাধিক বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কার্যক্রম জনবসতির খুব কাছাকাছি এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানতে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাহমুন আরা সুলতানার সরকারি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসক একটি সভায় ব্যস্ত থাকায় বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলি বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি আংশিক অবগত আছি। অভিযোগের বিষয়গুলো জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন, নদীপথে চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নীরবতা কেন? দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা জনপদ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আলোকদিয়া চরের বাসিন্দারা।










