মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ আলোকদিয়া চরাঞ্চল বর্তমানে ভয়,আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জনপদে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ বালু উত্তোলন,নদীপথে সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক তৎপরতার ঘাটতিকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিকটবর্তী নদী অংশে একাধিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সেকশন কাটার মেশিন, ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নদীপথে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়মিত চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান,নদীতে চলাচলকারী বিভিন্ন নৌযান ও বাল্কহেড থেকে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট নিয়মিত অর্থ আদায় করছে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে যমুনা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে নদীভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে শত শত পরিবারের বসতভিটা, কৃষিজমি এবং জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো। ইতোমধ্যে নিজেদের জীবন-জীবিকা ও সম্পদ রক্ষার দাবিতে এলাকাবাসী একাধিক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় তারা হতাশ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড, জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান ও স্থায়ী কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে,বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী জনবসতিপূর্ণ এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, সেতু, বাঁধ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও নির্ধারিত সুরক্ষা সীমার মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা, কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
(১৮ জুন ২০২৬ইং) বৃহস্পতিবার সরেজমিন অনুসন্ধানকালে যমুনা নদীর আলোকদিয়া চরসংলগ্ন অংশে একাধিক ড্রেজারকে সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের দৃশ্যও পরিলক্ষিত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,এসব কার্যক্রম জনবসতির অতি নিকটবর্তী এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রানী কর্মকার অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জিবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বচ্চ সংখ্যক অভিযান পরিচালনা করেছেন।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নদী রক্ষায় নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে বেশ কয়েকবার অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ,অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান ও সমন্বিত তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম। এলাকাবাসী আশা প্রকাশ করে বলেন, ফরিদপুর রিজিওনাল নৌপুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীপথে চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ও জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানতে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাহমুন আরা সুলতানার সরকারি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসক একটি সভায় ব্যস্ত থাকায় বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি আংশিক অবগত আছি। অভিযোগের বিষয়গুলো জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন—দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন, নদীপথে চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় কেন? তাদের দাবি, অবিলম্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, অভিযুক্ত চক্রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, নদীপথে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের তদন্ত এবং নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা জনপদ রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এটি শুধু পরিবেশ ও নদী ব্যবস্থাপনার লঙ্ঘন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন,জননিরাপত্তা বিপন্নকরণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের আওতায়ও তদন্তযোগ্য বিষয় হতে পারেন।














