যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে নৌযান থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়, হামলা ও জিম্মি করার অভিযোগে কথিত ‘সালাম বাহিনী’র বিরুদ্ধে আতঙ্ক ছড়িয়েছে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ নৌপথে। নৌযান মালিক, মাঝি ও শ্রমিকদের অভিযোগ—দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নদীপথে প্রভাব বিস্তার করে নৌযান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসে হামলা ও মারধরের খড়্গ—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট ঢাকা-সিরাজগঞ্জ নৌপথের টাঙ্গাইলের কাকুয়া-কলাবাগান এলাকায় চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করা হলে শুকানি রুহুল আমিন ও রানা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় কথিত ‘সালাম বাহিনী’র প্রধান আব্দুস সালাম আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। পরে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে রুহুল আমিন ও রানাকে গুরুতর আহত করা হয় বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
তাদের ভাষ্য, হামলার সময় আব্দুস সালামের সঙ্গে কাওছার আলম, মাসুদ,রুজবেল, হাবিব, বাপ্পি ও কাওছারসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।৩ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদার অভিযোগ
স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, যমুনার বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী নৌযান থেকে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌযান থামিয়ে মারধর,লুটপাট, অস্ত্রের মুখে জিম্মি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ তাদের।
কয়েকজন নৌযান মালিক আরও দাবি করেছেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ভয়ও দেখানো হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
যে নৌপথগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলছেন স্থানীয়রা
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চর পুংলি, পানাকুড়া, কাকুয়া, গোয়ালা হোসেন, গোয়ালা, জিদাও, ডেইকাবাড়ি, কান্দিপাড়া ও কালিবাটিনসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের নৌপথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।বিশেষ করে গোয়ালা হোসেন থেকে জিদাওয়ের মধ্যবর্তী নদীপথকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার মেহেরনগর, চরবেল,খিদ্রচাপড়ি, রানদানপুর, বারবালা, সেটেল চর ও মহেশপুর এবং টাঙ্গাইলের কাকুয়া-কলাবাগান এলাকার নৌপথ নিয়েও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নৌযান মালিক ও মাঝি বলেন,দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নদীপথে প্রভাব বিস্তার করে আসছে বলে তাদের অভিযোগ। কিন্তু হামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না অনেকেই।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন এমপি টুকু
‘সালাম বাহিনী’র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে টাঙ্গাইল-৫ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন টুকু বলেন, তিনি আগে এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তবে অভিযোগ ওঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাবেন তিনি।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।নদীপথে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠেছে—দুর্গম যমুনার নৌপথে নিয়মিত নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল কতটা কার্যকর?
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের দাবি,নৌপথে নৌ-পুলিশ,কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে চাঁদাবাজি,হামলা ও জিম্মি করার অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তারা।স্থানীয়দের আশঙ্কা,অভিযোগগুলো তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যমুনার নৌপথে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়তে পারে নৌযান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নদীপথে কর্মরত শত শত শ্রমিকের নিরাপত্তা।



















