একাধিক লিখিত অভিযোগ,ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর মানববন্ধন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার পরও মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম আলোকদিয়া চরে থামছে না কথিত অবৈধ বালু উত্তোলন। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন এলাকা, বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশ থেকে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধনও করেছেন স্থানীয়রা। এমনকি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি বালু উত্তোলনকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীর তীর, কৃষিজমি ও বসতভিটা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের পর অভিযোগ, তবুও বন্ধ হচ্ছে না
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন—প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযান সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার আশপাশে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকে?
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার খবর আগেভাগে ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে অভিযানের সময় সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে প্রশাসনের ভেতর থেকে কেউ অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের তথ্য সরবরাহ বা কোনো ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশাসনের অভিযানেও ‘অধরা’ বালু উত্তোলনকারীরা
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রানী কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী এরই মধ্যে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ইউএনও বলেন, “গত ৬ আগস্ট বিপুল পরিমাণ জনবল নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে যাই। তবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বালু উত্তোলনকারীরা সেখান থেকে সরে পড়ে।”
প্রশাসনের এ বক্তব্যের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, অভিযানের আগে কীভাবে বালু উত্তোলনকারীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রশাসনের অভিযান সম্পর্কে তারা আগাম তথ্য পাচ্ছে কি না।
সরেজমিনে মিলেছে ভিন্ন চিত্র
তবে প্রশাসনের অভিযানের দুই দিন পর, ৮ আগস্ট ২০২৬ সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সরেজমিনে আলোকদিয়া চরের জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও এর আশপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে প্রায় ৮টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের আশপাশ এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রচলিত আইন, পরিবেশগত বিধিনিষেধ এবং সরকারি অবকাঠামোর নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধান উপেক্ষা করে যদি কেউ বালু উত্তোলন করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। বিশেষ করে জাতীয় গ্রিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর আশপাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাটি বা বালু অপসারণের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি কেবল পরিবেশগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, একাধিক লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন এবং প্রশাসনিক অভিযানের পরও যদি একই এলাকায় প্রকাশ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের বাধা কোথায়?
তদন্ত ও স্থায়ী ব্যবস্থা চান এলাকাবাসী
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা করে চলে আসা নয়—অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অভিযানের তথ্য আগাম ফাঁসের অভিযোগও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের আরও দাবি, অবৈধ ড্রেজারগুলো জব্দ, বালু উত্তোলনের স্থানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা এবং সরকারি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের পরও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—প্রভাবশালী বালু উত্তোলনকারীরা কি প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনের আওতার বাইরে? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরেজমিন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই এর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।




















