মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম আলোকদিয়া চর। চারদিকে নদী আর চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। দুর্গম এই ভূখণ্ডকেই নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান ও কঠোর অবস্থানের মধ্যেও সুযোগ বুঝে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে সরকারি সম্পদ লুটের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সরেজমিনে আলোকদিয়া চর এলাকায় গিয়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন নদীর অংশে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চল ও নদীপথের সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কোথাও কোথাও সশস্ত্র পাহারার অভিযোগও রয়েছে। প্রশাসনের তৎপরতায় চক্রটির মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলেও সুযোগ পেলেই তারা আবার ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে।সরকারি সম্পদ লুট, ঝুঁকিতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো,অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে যমুনার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, নদীতীর ভাঙন এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের কাছাকাছি থেকে বালু উত্তোলনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু তুলে নেওয়া হলে স্রোতের গতিপথ ও নদীর তলদেশের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে নদীতীর, বসতভিটা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর। তাদের প্রশ্ন—যমুনার বুক চিরে কারা সরকারি সম্পদ লুট করছে, কার ইন্ধনে চলছে এসব ড্রেজার, আর কারা তাদের পেছনে থেকে শক্তি জোগাচ্ছে?
বালুমাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে শিবালয় উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানানো হয়েছে।
আর এক্ষেত্রে প্রশংসিত হচ্ছেন, শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম চরাঞ্চল ও উত্তাল যমুনার ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি বিভিন্ন সময় আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান স্থানীয়দের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। স্থানীয়দের একজন বলেন, প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের মধ্যে আগের মতো দাপট নেই। তবে অভিযান থেমে গেলেই তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তাই ইউএনওর নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নদী রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশংসনীয়
বাংলাদেশ নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ইউএনও মনিষা রানী কর্মকারের সাহসী ভূমিকা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তবে তাদের মতে,বিশাল যমুনা নদীপথে অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে শুধু স্থলভাগের অভিযান যথেষ্ট নয়। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নৌপুলিশকে সমন্বিতভাবে নদীপথে নজরদারি বাড়াতে হবে।
নৌপুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার দাবি স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষে প্রতিটি মুহূর্তে যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে নজরদারি করা সম্ভব নয়। এ কারণে নদীপথে নিয়মিত টহল, অবৈধ ড্রেজার শনাক্ত, জব্দ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নৌপুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শুধু ড্রেজার জব্দ করলেই হবে না; এর নেপথ্যে থাকা অর্থদাতা, ড্রেজার মালিক, পরিচালনাকারী ও মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নদীপথে সংঘর্ষ, হামলা ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
‘
কাউকেই অবৈধভাবে বালু তুলতে দেওয়া হবে না’অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় শিবালয় উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। কাউকেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না।তিনি আরও জানান, যমুনার নৌপথে অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে নৌপুলিশকে আরও জোরদার টহলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বালুমাফিয়াদের উদ্দেশে প্রশাসনের বার্তা—নদী লুটের দিন শেষ স্থানীয়দের মতে, যমুনা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। প্রভাব, পেশিশক্তি কিংবা দুর্গম চরাঞ্চলের সুযোগ নিয়ে যারা নদীর বুক থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুটের চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। শুধু ড্রেজার জব্দ করে অভিযান শেষ করলে হবে না—অবৈধ বালু উত্তোলনের নেপথ্যের মূলহোতা ও অর্থের জোগানদাতাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, ইউএনওর সাহসী নেতৃত্ব এবং নৌপুলিশের কার্যকর নজরদারি একসঙ্গে চললে যমুনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অবৈধ বালু ব্যবসার চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরকারি সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এই ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান অব্যাহত থাকুক—এটাই এখন শিবালয়বাসীর প্রত্যাশা।

















