ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে কেবল বড় অবকাঠামো প্রকল্প কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পারস্পরিক মর্যাদা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতে বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে রাজনৈতিক স্বার্থে সম্পর্ককে ব্যবহার করার প্রবণতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি।
রিয়াজ হামিদুল্লাহর মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সফর ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা চিঠিতে মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও যৌথ সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, বিপুল অর্থের মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে—এমন উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকেন্দ্রিক উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে। তাই উত্তেজনা ছড়ায় এমন খবরের পরিবর্তে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানান, বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে বাংলাদেশ যেমন গুরুত্ব দেয়, তেমনি বাংলাদেশের উদ্বেগ ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ভারতের বোঝা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় বাংলাদেশে সংঘটিত সহিংসতা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ভারতীয় গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে তাঁর মনে হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভের পেছনের কারণগুলো অনুধাবন করতে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশের যেকোনো বিষয় নিয়ে পূর্বশর্ত ছাড়াই খোলামেলা আলোচনায় বাংলাদেশ প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন।দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে তাঁর বক্তব্য, সরকারি হিসাবে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার হলেও চিকিৎসা পর্যটন এবং অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বৃহত্তর যোগাযোগের পরিমাণ ২৮ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি ভিসা ও মানুষের যাতায়াতের বিষয়গুলোকে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও নবায়নের প্রসঙ্গে রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, পানিকে শুধু পরিমাণগত হিসাব বা অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার পলি ও নদীর বাস্তুতন্ত্র বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় দেশের নিজস্ব লক্ষ্য ও বৈচিত্র্যকরণের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভারতের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের পেশাগত সম্পর্কও সুদৃঢ় বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ১৯৭১ সালের গণহত্যার ইতিহাস স্মরণে রেখেই বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক কূটনীতির নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে।














