মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের তিশোরি মৌজা সংলগ্ন যমুনা নদীতে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের পাশ ঘেঁষে প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের ভয়াবহ মহোৎসব। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেকশন কাটার মেশিন ও শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত নদীর তলদেশ কেটে বালু উত্তোলন করায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোসহ নদী তীরবর্তী শতাধিক বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশাসনের চোখের সামনে কার্যত বালু লুটের মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে,জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন যমুনা নদীতে দুটি শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু সরাসরি নদীতে নোঙর করা অসংখ্য বাল্কহেডে তোলা হচ্ছে এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ,প্রতিদিন শতাধিক বাল্কহেডে বালু লোড করে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে স্থানীয় মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স ও তার সহযোগী সফিকসহ একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের ছত্রছায়ায় যমুনা নদীকে কার্যত লুটের মাঠে পরিণত করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে আরও দেখা যায়, ড্রেজারের আশপাশে অবস্থান করছে ১০ থেকে ১৫ জন সশস্ত্র যুবক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের নেতৃত্বে রয়েছে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের আলোচিত আন্তজেলা ডাকাত বাপ্পি ও রকি—যারা ২০২৩ সালে র্যাব-১২ এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। অভিযোগ রয়েছে,এই বাপ্পি ও রকি নতুন করে আবার ও ফিরেছে তাদের পুরোনো পেশা দস্যুতা,এমনকি অপহরণ করে মুক্তিপন আদায় সহ নানান অপরাধে,আর বাপ্পি ও রকির নেতৃত্বেই ড্রেজার পাহারা দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পাহারায় থাকা এসব যুবক মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স ও সফিকের অনুসারী। তাদের নির্দেশেই এই অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেকেই আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, জাতীয় গ্রিডের টাওয়ারের এত কাছে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে টাওয়ারের ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে যে কোনো সময় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি নদীর তীব্র ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায় আশপাশের কয়েকশ বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি আইনবিরোধী।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা,সেতু, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া নদী ও পরিবেশ সুরক্ষায় সংবেদনশীল এলাকায় বালু উত্তোলনের ওপর উচ্চ আদালতেরও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবুও প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর এত কাছাকাছি প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে দিনের পর দিন অবৈধ বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের নজরদারি কোথায়? অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র প্রভাব খাটিয়ে বা প্রশাসনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ড্রেজার অপসারণ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও নদীতীরবর্তী জনবসতির জন্য যে কোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।













