প্রশাসনের চোখের সামনেই ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল পরিণত হয়েছে বালু মাফিয়াদের অভয়ারণ্যে।
দিনের পর দিন সশস্ত্র পাহারায় চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদী কাটা পড়ছে জীবন্ত দেহের মতো—আর নীরব দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন।
ফরিদপুর সদর উপজেলার সিএন্ডবি ঘাট ডিগ্রির চর, ডিক্রি চর, নর্থ চ্যানেল, টিলার চর, ইন্তাজ মোল্লার ডাঙ্গী, সাবুল্লা শিকদার ডাঙ্গী, জক্রেস্বর ও আলীয়াবাদ এলাকায় প্রকাশ্যেই বসানো হয়েছে একের পর এক ড্রেজার।
একই দৃশ্য মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চর বাঘুটিয়া, বাঘুটিয়া বাজার, বাঁচা-মরা চর এবং শিবালয় উপজেলার চর তেওতায়। সশস্ত্র পাহারা, আতঙ্কে চরবাসী স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় বালু মাফিয়ারা এতটাই বেপরোয়া যে ড্রেজারের চারপাশে রাখা হয়েছে দেশীয় অস্ত্রধারী পাহারাদার।
কেউ ছবি তুললে, কেউ প্রতিবাদ করলে সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে আইন, প্রশাসন আর আদালতের আদেশ—সবই যেন এখানে অকার্যকর। আলম শেখ ও প্রিন্সের চক্রের দাপট সরেজমিন অনুসন্ধানে ফরিদপুর সদর উপজেলার একাধিক চরে দেখা যায়, আলোচিত বালু মাফিয়া আলম শেখের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সশস্ত্র পাহারায় একাধিক ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন চালাচ্ছে।
অন্যদিকে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চর বাঘুটিয়া ও বাঁচা-মরা চরে মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্সের লোকজন একই কায়দায় নদী নিঃশেষ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ছেঁড়া কাগজ!
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র শিবালয় উপজেলার চর তেওতা এলাকায়। সেখানে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটির একেবারে গোড়া থেকে বালু কেটে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই এলাকায় বালু উত্তোলনের ওপর হাইকোর্টের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবুও আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রভাবশালী একটি চক্র অবাধে বালু লুটে নিচ্ছে।
এর ফলে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ টাওয়ার—যা পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এই আইনে অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলনের দায়ে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড,৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, এবং ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি জব্দের বিধান রয়েছে।
এছাড়া হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সরাসরি আদালত অবমাননা, যার শাস্তি আরও কঠোর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন থাকলে কেন থামছে না এই দৌরাত্ম্য? প্রশাসনের বক্তব্য, বাস্তবতায় প্রশ্ন,ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনবল সংকট থাকলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নদী কাটছে, চর ভাঙছে, মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে—আর বালু মাফিয়ারা আরও বেপরোয়া হচ্ছে।
চরবাসীর ক্ষোভ চরবাসীর কণ্ঠে এখন একটাই প্রশ্ন—প্রশাসন কি অপেক্ষা করছে বড় কোনো দুর্ঘটনার?
নাকি বালু মাফিয়াদের এই দাপটের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কোনো ছত্রছায়া? দ্রুত যৌথ অভিযান, ড্রেজার ধ্বংস এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ফরিদপুর-মানিকগঞ্জের চরাঞ্চল অচিরেই পরিণত হবে এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রে—এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয়দের।











