খন্দকার মোহাম্মাদ আলী:
জীবন আর জীবিকা যেন প্রতিটি প্রাণের চিরন্তন বন্ধন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ বাস্তবতার বলয়ে জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক খুঁজে ফেরে। শিশু বয়স, যৌবন কিংবা বার্ধক্য—প্রতিটি সময়েই জীবিকার প্রয়োজন মানুষকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এ বিষয়ে সমাজের সচেতন মহলরা জানান, একই পৃথিবীতে বসবাস করলেও অঞ্চলভেদে মানুষের জ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারায় রয়েছে ভিন্নতা। তবে সবকিছুর মাঝেই মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে জীবিকার পথ খুঁজে নেয়। বর্তমান সময়ে সেই জীবিকার প্রয়োজনেই লাখ লাখ মানুষ পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাঁদের বলা হয় “রেমিট্যান্স যোদ্ধা”।
এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য বেদনা ও ত্যাগের গল্প। পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্নে তারা দেশের বাইরে কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে সংসারে নেমে আসে অশান্তি। কেউ হারান পারিবারিক বন্ধন, কেউ বা সন্তানদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। অভিভাবকহীন পরিবেশে অনেক পরিবার অসামাজিক কর্মকাণ্ডের শিকার হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, অনেক রেমিট্যান্স যোদ্ধার উপার্জনে পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা এবং দেশের অর্থনীতিও হয়েছে সমৃদ্ধ। দেশের উন্নয়নে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্র কি শুধুই তাঁদের পাঠানো অর্থের দিকে তাকিয়ে থাকবে, নাকি দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাঁদের পরিবারসহ নিজ দেশে জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করবে?
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষকে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সামাজিক ও মানবিক দিক থেকে উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁদের জীবনের কষ্ট, ত্যাগ ও বাস্তবতা মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের আড়ালে পরিবার, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকরা জানান, সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা একদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন নিজেদের বসতভিটায়, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে।











