কালশী উড়ালসড়কের র্যাম্পের নিচে মাটিতে বিছানো পাতলা একটি মাদুরে শুয়ে আছে তিন শিশু। ঝুম বৃষ্টি আর ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে তাদের গায়ে কালো একটি কম্বল জড়িয়ে দিয়েছেন মা। পাশে বসে আছেন তিনি। মা রাজিয়া বেগমের চোখে ঘুম নেই, মুখে ক্লান্তির ছাপ। আগুনে পুড়ে গেছে মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই। এর মধ্যেই প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ স্বামী। সামনে কী আছে, জানেন না রাজিয়া।
আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালশী উড়ালসড়কের নিচে দেখা যায় রাজিয়াকে। পাশে শুয়ে আছে ১০ মাস বয়সী ছেলে ইব্রাহিম, তিন বছরের মেয়ে মানসুরা ও সাত বছরের মেয়ে আদুরি। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বস্তিতে আগুন লাগে। আগুনে প্রায় ১ হাজার ২০০ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানেই রাজিয়ার ঘরটিও ছিল।
রাজিয়া গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিনটি বাসায় কাজ করে মাসে প্রায় ৭ হাজার টাকা আয় করেন। সেই আয়েই কোনোরকমে চলছিল পাঁচ সদস্যের সংসার। কিন্তু আগুনে ঘরসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এর আগেই আরেক বিপদ নেমে আসে তাঁর জীবনে। রাজিয়ার ভাষ্য, ২০ মে স্বামী রতন মিয়া রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
আগুন লাগার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন রাজিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘পোলা-মাইয়া নিয়া খাইতে বইসিলাম। হঠাৎ কারেন্ট চইলা গেল। তহন মাইনষের চিৎকার–চেঁচামেচি, আগুন লাগসে, আগুন। কোনোমতে পোলারে কোলে নিয়া, মাই দুইডারে হাতে ধইরা ঘর থেইকা বাইর আইসি। কিস্যু আনতে পারি নাই। সব পুইড়া ছাই হইয়া গেসে।’
সন্তানদের নিয়ে সারা রাত উড়ালসড়কের নিচেই কাটিয়েছেন মা রাজিয়া । খাওয়াদাওয়ার অবস্থাও ছিল করুণ। রাজিয়া বলেন, ‘রাইতে কোনো খাওন জুটে নাই। পোলা-মাইয়ারে রুটি আর কলা কিন্না দিসিলাম। নিজে কিসু খাই নাই। আইজকা সকালে তিন প্যাকেট খিচুড়ি পাইসি। ওইডাই খাওয়া। দুপুরে কিসু পাইনাই এহনো।
যে এক কক্ষের ঘরে তাঁরা থাকতেন, তার মাসিক ভাড়া ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। স্বল্প আয়ের সংসারে সেটিই ছিল তাদের নিরাপদ আশ্রয়। এখন সেই ঘর নেই। নেই ঘরের কোনো জিনিসপত্রও। তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা যেন গ্রাস করে আছে রাজিয়াকে। আগুনে সব হারানোর কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বামীর অনুপস্থিতি। রাজিয়া বলেন, ‘এহন কেমনে চলুম, জানি না। হেগো (সন্তানদের) বাপেও তো খবর নিল না।
কথা বলতে বলতে সন্তানদের গায়ের কম্বল ঠিক করে দিচ্ছিলেন তিনি। মাঝেমধ্যে সন্তানদের মুখে বসা মশা-মাছি হাত নেড়ে সরিয়ে দিচ্ছিলেন রাজিয়া। জানালেন, তাঁর অপেক্ষা—স্বামী তাদের খোঁজ নিক, ফিরে আসুক। তবেই নতুন করে শুরু করার সাহস পাবেন তিনি। যোগাযোগ করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে অভিমানের সুরে বললেন, ‘ফোন করমু কেন, আগুন লাগসে দুনিয়ার মানুষ জানে। আমার লগে নই রাগ আছে, তার কি সন্তানগো লাগি কোনো মায়া নাই?’
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, বস্তিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ঘর ও দোকান ছিল। আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার লোক এ বস্তিতে বাস করতেন। গতকাল রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণের তথ্য জানায় ফায়ার সার্ভিস। দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে ছাইয়ের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছেন পুড়ে যাওয়া বা বেঁচে যাওয়া জিনিস। কারও হাতে ভাঙা লাঠি, কেউ খালি হাতেই সরাচ্ছেন পোড়া টিন আর কয়লার স্তূপ। কেউ হয়তো খুঁজছেন একটি হাঁড়ি, কেউ গ্যাসের চুলার কোনো অংশ। আগুনের ভয়াবহতায় প্রায় সবকিছু পুড়ে গেলেও মানুষের আশা যেন শেষ হয়ে যায়নি। শেষ সম্বল থেকে কিছু একটা উদ্ধার করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।











