ভারতের স্বাধীন গণমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রচারণায় বছরের পর বছর ধরে “কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী” সংক্রান্ত অতিরঞ্জিত দাবি ও স্লোগান শোনা গেছে। অথচ, সরকারি পক্ষ থেকে প্রায়শই স্বীকার করা হয়েছে যে এই অনুপ্রবেশকারীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কিন্তু যখন এক অনিশ্চিত পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক নিশ্চিতায়নে রূপ দেওয়া হয়, তখন তার চড়া মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকদের।
২০২৬ সালের ১ জুন, বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বাধায় ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) একটি পুশব্যাকের (অবৈধভাবে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার) প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর ফলে বেনাপোল সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েন নারী ও শিশুসহ ১০ জন মানুষ। তাদেরকে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ একটা দিন এবং রাত তারা দুটি দেশের মধ্যবর্তী এক টুকরো জমিতে চরম অনিশ্চয়তায় বন্দি হয়ে রইলেন—কোনো পক্ষই তাদের গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হলে এই সংকটের অবসান ঘটে।
সীমান্তের সেই দৃশ্যটি প্রতিটি বিবেকবান নাগরিককে বিচলিত করা উচিত। একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত মূলত সার্বভৌমত্ব চিহ্নিত করার জন্য, মানুষকে অধিকারহীন, রাষ্ট্রহীন বা প্রতিকারহীন করার কোনো ফাঁদ হতে পারে না। বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত সুরক্ষিত করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা, পাচারকারী চক্র দমন করা এবং জাল নথির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ভারতের রয়েছে। কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সীমান্তে আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্থগিত রেখে তার সীমান্ত রক্ষা করতে পারে না।
এই বিপদ মোটেও কাল্পনিক নয়। গত বছর মুর্শিদাবাদের এক পরিযায়ী শ্রমিক এবং ভারতের বৈধ নাগরিক আওয়াল শেখকে বাংলাদেশি সন্দেহে চেন্নাইয়ের একটি ডিটেনশন সেন্টারে (আটক কেন্দ্র) প্রায় এক বছর বন্দি রাখা হয়েছিল। মাদ্রাজ হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের পর অবশেষে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু একটি বছর যে তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল এবং যে স্বাধীনতা তিনি হারালেন, তা কি একটি মুক্তি আদেশ দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? তার এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে—যখন ভাষা, সামাজিক শ্রেণী বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব বিচার করা হয়, তখন প্রশাসনিক সন্দেহ কীভাবে একটি নির্মম শাস্তিতে পরিণত হতে পারে।
সুনালী খাতুনের মামলাটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। গর্ভবতী এই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এই ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই গড়ায়। তার ঘটনাটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—একজন দরিদ্র শ্রমিককে প্রথমে দেশছাড়া করা হতে পারে, আর তার শুনানির সুযোগ আসবে অনেক পরে! রাষ্ট্র যখন যাচাই-বাছাই না করেই এমন পদক্ষেপ নেয়, তখন নাগরিকত্ব নিজেই চরম ঝুঁকিতে পড়ে।
বর্তমানে অভিবাসন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি বিশেষ নীতি—”ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট” বা ৩ডি নীতি। এই প্রেক্ষাপটেই উপরের ঘটনাগুলোকে বিচার করতে হবে। অবৈধ অভিবাসন রোধ করা রাষ্ট্রের অধিকার ও দায়িত্ব উভয়ই। তবে, এই “চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার” নীতি যদি যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কার্যকর করা হয়, তবে তা সংবিধান এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরীহ নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করাও সমভাবে অপরিহার্য।
কাগজে-কলমে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করা, সরকারি রেকর্ড থেকে ভুয়া নাম বাদ দেওয়া এবং যাচাইকৃত বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কার করা একটি দৃঢ় প্রশাসনিক কর্মসূচি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই এবং বিচারিক তদারকি না থাকলে, এটি বাংলাভাষী মানুষের বিরুদ্ধে একটি ঢালাও নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের দেখলেই “বাংলাদেশি” বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সন্দেহের ভিত্তি কোনো প্রমাণিত প্রমাণ নয়, বরং তাদের ভাষা, নাম, ধর্ম, পোশাক, উচ্চারণ বা নির্দিষ্ট জেলা। মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমানের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে আটক, দফায় দফায় নথিপত্র পরীক্ষা, হেনস্থা, বহিষ্কারের হুমকি এবং কিছু ক্ষেত্রে সীমান্তের ওপারে পুশইনের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগে: ভারতে বাংলা ভাষায় কথা বলাটা কবে থেকে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াল?
বাংলা কোনো বিদেশি ভাষা নয়। এটি ভারতের অন্যতম প্রধান একটি ভাষা, যা কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের মাতৃভাষা। মুর্শিদাবাদের একজন শ্রমিক যখন দিল্লি, চেন্নাই, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কেরালা বা গুজরাটে কাজ করতে যান, তখন শুধু বাংলা ভাষার কারণে তিনি কম ভারতীয় হয়ে যান না। বাংলাভাষী শ্রমিকদের ঢালাওভাবে ‘বিদেশি’ বলে ধরে নেওয়া কোনো কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার লক্ষণ হতে পারে না।
সমস্যাটি এটা নয় যে অবৈধ অভিবাসন নেই; অবশ্যই তা রয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রায় ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার (প্রায় ৪,০৯৭ কিমি) দীর্ঘ, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত। দেশভাগ, নদীমাতৃক ভূগোল, দারিদ্র্য, পাচার এবং অনিয়মিত শ্রমের যাতায়াতের কারণে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০১৪ সাল থেকে কাঁটাতারের বেড়া, ফ্লাডলাইট, নজরদারি ব্যবস্থা ও সীমান্ত অবকাঠামো তৈরিতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, তবে তার জবাবদিহিতা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থার ওপর বর্তায়। এর দায় সাধারণ বাংলাভাষী শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী প্রত্যর্পণ, বহিষ্কার এবং প্রত্যাবাসনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অপরাধী প্রত্যর্পণ হলো চুক্তির ভিত্তিতে কোনো অপরাধী বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হস্তান্তর করা। বহিষ্কার হলো অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। আর প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন যে, ওই ব্যক্তি আসলেই যে দেশে তাকে পাঠানো হচ্ছে সেখানকার নাগরিক কি না তা নিশ্চিত করা।
কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কেবল সন্দেহের বশে কারও নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারেন না। ভারত কাউকে বাংলাদেশি বললেই বাংলাদেশ তাকে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
ঠিক এই কারণেই ‘পুশব্যাক’ অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি আটক, তদন্ত, নাগরিকত্ব যাচাই, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, ভ্রমণ নথিপত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট সীমান্ত পয়েন্টে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। এই আইনি প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হতে পারে, তবে এটি কোনো ভুল বা অবিচার রোধ করার জন্যই তৈরি হয়েছে। যখনই এর পরিবর্তে রাতের অন্ধকারে অনানুষ্ঠানিক পুশব্যাক বা সীমান্ত চাপ প্রয়োগের কৌশল নেওয়া হয়, তখন নাগরিক এবং অভিবাসী—উভয়ই চরম নির্যাতনের শিকার হন।
আটক কেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টারগুলো এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ২৪ পরগনা বা অন্য কোথাও যদি সন্দেহভাজন বিদেশিদের আটকে রাখা হয়, তবে সেই কেন্দ্রগুলো যেন আইনের ঊর্ধ্বে কোনো অন্ধকূপে পরিণত না হয়। প্রত্যেক বন্দির আইনি সহায়তা, পরিবারের সাথে যোগাযোগ, চিকিৎসাসেবা, দোভাষীর সুবিধা এবং আটকের লিখিত কারণ জানার অধিকার থাকতে হবে। এর জন্য স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং যাচাই-বাছাইয়ের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণের নথিপত্র ছাড়া কাউকে সীমান্তে পাঠানো উচিত নয়।
নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধীরগতি একটি বড় সমস্যা। হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে, যার ফলে তদন্ত বা সাজা শেষ হওয়ার পরও মানুষ বছরের পর বছর কারাবন্দি বা ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকছেন। কিন্তু প্রশাসনিক বিলম্বের অজুহাতে কোনো বেআইনি শর্টকাট বা পুশব্যাক মেনে নেওয়া যায় না। ধীরগতির প্রক্রিয়ার সমাধান হলো একে স্বচ্ছ, ডিজিটাল, জবাবদিহিমূলক এবং সময়োপযোগী করা, আইনি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেওয়া নয়।
“অনুপ্রবেশ” নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা অতিরঞ্জিত প্রচারণার ফল এখন সমাজে দৃশ্যমান। বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের এখন কর্মস্থলে, রেল স্টেশনে, ভাড়াবাড়িতে এমনকি শ্রম বাজারেও সবসময় নথিপত্র সাথে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। তারা শহর গড়ে তুলছেন, রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি বানাচ্ছেন, অথচ প্রতিনিয়ত এই ভয়ে বাঁচছেন যে—কখন তাদের ভাষা বা পদবি তাদের সন্দেহভাজন বানিয়ে দেবে।
ভারতের অবশ্যই জানা উচিত কে তার ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। তবে একই সাথে রাষ্ট্রকে এটাও জানতে হবে যে কারা তার নিজের নাগরিক। একজন দরিদ্রতম শ্রমিককে যেন কেবল তার উচ্চারণ, ধর্ম বা জন্মস্থানের কারণে প্রতিদিন নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে না হয়।নাগরিকত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত সুবিচার, সন্দেহ নয়।














