দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জীবনকথা-সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়,এটি একটি আদর্শ, একটি দায়িত্ব। কাকতালীয়ভাবে এ পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি। কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বর্তমান সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়ি জন্মগ্রহণকারী এই প্রবীণ সাংবাদিক জানান, মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন ১৯৭৬ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌরএলাকার ভূষণা গ্রামে। তিনি বলেন, সে সময় তাঁর পরিচয় হয় লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্তের সঙ্গে।
কাজল দত্ত তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ সময় বাবু কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার অন্যতম সমস্যা “কুমিল্লার দুঃখ গোমতী” নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার পরামর্শ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখতে শুরু করেন। বারবার লিখে ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে একসময় একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা প্রস্তুত করেন। পরে সেই লেখাটি কাজল দত্তের কাছে দিলে তিনি এবং কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয় (কুমিল্লা হাই স্কুল)’র প্রখ্যাত শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লা স্যার যৌথভাবে সেটি সম্পাদনা করেন। তাঁদের সম্পাদনায় লেখাটি সংবাদে রূপ নেয় এবং প্রকাশিত হয় ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায়। এবিএম আতিকুর রহমান বাশার জানান, সংবাদটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ জাতীয় সংসদে কুমিল্লার দুঃখ গোমতী” প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপ-মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী কাজটি সম্পাদনে উদ্যোগ নেন, এরই মধ্যে তাঁর মামা এবিএম গোলাম মোস্তফা সাবেক সচিব, মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর তিনি গোমতী বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে তিন জাতীয় সংসদ সদস্য ও প্যানাল স্পিকার হয়েছিলেন। এবিএম গোলাম মোস্তফা দায়ীত্ব পালন করাকালীন সময়ে গোমতী বেরীবাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। তবে এই সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের কষ্ট এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
তাঁর ভাষায়, “গত ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে লেখনীর মাধ্যমে মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেছি। সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য পত্রিকায় কাজ করেছেন। একতা,দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজ,দৈনিক ভোরের কাগজে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। পরে তিনি দীর্ঘ ১২ বছর প্রথম আলো পত্রিকায় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠ-এর দেবিদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮০সালে তিনি দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে ও ওই প্রেসক্লাবের সভাপতি। তার হাত ধরেই দেবিদ্বারে অসংখ্য সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি জীবীত সাংবদিকদের মধ্যে দেবিদ্বার উপজেলায় বর্তমানে তাঁর চেয়ে সিনিয়র কোনো সাংবাদিক নেই। সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবিএম আতিকুর রহমান বাশার বলেন,”সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০’র পর থেকে নতুন ধারার সংবাদপত্র, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া ও সাংবাদিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও ২০০১ সালের পর থেকে অপসাংবাদিকতার বিস্তার ঘটেছে। প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি। অনেকেই শুধু গলায় পরিচয়পত্র, হাতে ডায়েরি ও পকেটে কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন।
এসব কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের কাছে পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন,”অনেকে সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও রাখেন না। একটি সাধারণ শোকসংবাদ পর্যন্ত লিখতে পারেন না। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও ভেতরে সাংবাদিকতার জ্ঞান নেই। অপসাংবাদিকতা রোধে তিনি দক্ষ,শিক্ষিত, সৎ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় যুক্ত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালু করা হলে ভবিষ্যতে দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক তৈরি হবে এবং অপসাংবাদিকতা অনেকাংশে কমে আসবে। তা ছাড়া গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যম কর্মীদের ক্ষেত্রেও একটি নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় হলো তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন, তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না। প্রেসক্লাবের সদস্যপদ গৌণ বিষয়। তিনি জানান,দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে বর্তমানে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। সদস্যপদ তিন ধরনের—দাতা সদস্য, সহযোগী সদস্য ও মূল সদস্য। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে এবিএম আতিকুর রহমান বাশার বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং দীর্ঘ সময় কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতি করে আছেন। তবে সাংবাদিকতা জীবনে তিনি সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি চলমান অপ-সাংবাদিকতার প্রভাবে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
কিন্তু মানুষের আকাংখ্যা বাস্তবায়নে সাংবাদিকতা থেকে সড়ে আসতে পারছেন না। ঘটনা ঘটলেই মানুষ ঘটনার সত্যতা জানতে চান, শুধু তাই নয়, জেলা পর্যায়ের সাংবাদিক, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, প্রবাসের লোকজন ঘটনার সঠিক বিষয়টা জানতে চান। তাই অনিচ্ছাসত্যেও বাধ্য হয়েই ঘটনার অনুসন্ধানে বের হতে হয়। তাই সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছে থাকলেও মানুষে আকাংখা বাস্তবায়েনে পেশা-নেশার বাহিরে দায়বদ্ধতা থেকে এ পেশায় আটকে আছি। ভাবছি বাকী জীবনটা দেবীদ্বারের ইতিহাস ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে লেখায় মনোনিবেশ হব।
ইতিমধ্যে যা বিচ্ছিন্নভাবে পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি একত্রিকরণে কাজ করব, বই আকারে প্রকাশ করব। এখানে উল্লেখ্য যে, দেবীদ্বারের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সহ নানা বিষয়ে লেখায় অনুপ্রেঢ়ণা যোগিয়েছিলেন, ১৯৭৮ সালে দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে ওই কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক তৈয়বুর রহমান, অধ্যাপক সফিকুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মনিরুল হক, অধ্যাপক রকিব উদ্দিন স্যার। সাংবাদিকতায় সম্মাননা প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, একজন মফস্বল সাংবাদিকের পরিরিধি ছোট। তার প্রচারনাও ছোট। তাই খুববেশী কিছু অর্জনের সুযোগ নেই। প্রাপ্তির মধ্যে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) কর্তৃক কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে দেশসেরা ১১ জন যুগরত্ন সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে এই স্বীকৃতি লাভ করেন। বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লার আয়োজনে আপনজন সম্মাননা এবং ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ‘সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা’র পক্ষ থেকেও নিরাপদ সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে বিশেষ অবদান রাখায় সম্মাননায় ভূষিত হন। এ ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন।












