মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়া চর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নাকের ডগায় ১০টিরও বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার (সেকশন কাটার) দিয়ে দিনরাত বালু উত্তোলন চলছে। এতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার,বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এবং কয়েক হাজার মানুষের বসতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে সোমবার (৩০ জুন ২০২৬) সকাল ৮টা থেকে আলোকদিয়া চরসহ যমুনার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, একাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শতাধিক বাল্কহেডে লোড-আনলোড করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ,পুরো কার্যক্রমটি সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং ঘটনাস্থলে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি সশস্ত্র পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান,একটি প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় এক মাস ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার,শত শত বসতবাড়ি, কয়েক হাজার বিঘা আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, মসজিদ ও মাদ্রাসা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য,এ ব্যাপারে গত (১১জুন ২০২৬)ইং তারিখে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০ জুন আলোকদিয়া চরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে মানববন্ধনও করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে,এসব উদ্যোগের পরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এলাকাবাসীর আরোও অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে নৌপুলিশ বা কোস্ট গার্ডকে জানানো হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। এরপর অভিযোগকারীরা বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়ছেন বলেও দাবি করেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, “এর আগে আমার নেতৃত্বে ২৫টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জুন মাস সরকারি অর্থ-বছরের সমাপনী মাস হওয়ায় এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাময়িক বিলম্ব হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পাটুরিয়া নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”তবে স্থানীয়দের দাবি,নির্দেশনার কথা বলা হলেও ঘটনাস্থলে নৌপুলিশ বা কোস্ট গার্ডের দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।
আইন যা বলছে,বিশেষজ্ঞদের মতে,অনুমোদন ছাড়া নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত বালুমহালের বাইরে বা নিষিদ্ধ এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, অবৈধ ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি জব্দসহ অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
এছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে যদি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, নদীর তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়েও বিবেচিত হতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি,অবৈধ বালু উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি অভিযান পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার ও জনবসতি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
















