বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের অভাব ঘোচাতে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন তৌফিক হোসেন (২২)। একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলা আন্দোলনের সময় হামলায় গুরুতর আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারালেন এই তরুণ। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত তৌফিক হোসেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবিবর রহমান তবি খাঁর ছেলে। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় লায়লা স্টাইল গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, গত সোমবার গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে একটি হামলার দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টা করছিলেন তৌফিক। এ সময় হামলাকারীরা তাঁর ওপর চড়াও হয়ে মারধর করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে সহকর্মী ও অন্য শ্রমিকেরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়।
তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়া জানান, কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে পোশাকশ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন। সোমবার আন্দোলন চলাকালে হামলার ঘটনা ভিডিও করার চেষ্টা করায় তাঁর ভাইয়ের ওপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের চাচা বাচ্চু মিয়া জানান, ২০২২ সাল থেকে গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন তৌফিক। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে এক বন্ধুর সহযোগিতায় তিনি লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন।
তৌফিকের সাবেক স্কুলশিক্ষক প্রদীপ কুমার জানান, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের অভাব দূর করার আশায় গাজীপুরে গিয়েছিলেন তৌফিক। তাঁর আহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর শিক্ষক ও পরিচিতজনেরা সুস্থ হয়ে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজ আলম জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে তৌফিকের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বুধবার তাঁর জানাজা ও দাফনের কথা রয়েছে।
কোচাশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ছয়ঘরিয়া গ্রামে তৌফিকের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
এদিকে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষে আহত এক শ্রমিকের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কারখানা বন্ধের দাবিতে বহিরাগত কিছু লোক সেখানে চাপ সৃষ্টি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করতে রাজি না হলে বহিরাগতদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে ওই শ্রমিক গুরুতর আহত হন। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান তিনি।
বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া তৌফিকের এমন মৃত্যুতে স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

















