দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে চট্টগ্রাম নগরবাসীকে মুক্তি দিতে নগরীর ৩৬টি খাল নিয়ে যে মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল তা শেষের দিকে।
এই প্রকল্পের পাশাপাশি অন্য আরও যেসব কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে সেগুলো শেষ হলে আগামী বছর নগরীর মানুষ বর্ষা মৌসুমে স্বস্তি পেতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের এমন আশাবাদী হয়ে ওঠার কারণ-নিম্নচাপ, সঞ্চালনশীল মেঘমালা আর আগাম সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এবার জ্যেষ্ঠের মাঝামাঝিতে টানা অতি ভারি বর্ষণের কবলে চট্টগ্রামবাসী
গত বর্ষায় তেমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হলেও টানা ভারি বৃষ্টিতে জোয়ারের সময়ে নগরীর কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। তবে ভাটার টান শুরু হতেই সে পানিও নামতে শুরু করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর জলাবদ্ধতা থেকে ৫০ শতাংশ ‘মুক্তি’ মিলবে, ‘পুরোপুরি মুক্তি’ মিলবে ২০২৬ এর শেষে জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে।
এতে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললেও আগামী ভরা বর্ষায় জুনের মধ্যভাগ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত পরিস্থিতি কেমন থাকে তা দেখার অপেক্ষায় আছেন তারা।
চট্টগ্রাম নগরীতে প্রকট হয়ে ওঠা জলাবদ্ধতার সংকট নিরসনে শুরুতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) নানান পদক্ষেপ নিলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এরমধ্যেই নগরীর বেশির ভাগ খালই দখলের কবলে পড়ে।
প্রতি বর্ষায় নগরীর চকবাজার, মুরাদপুর, বাকলিয়ার একাংশ, দুই নম্বর গেইট, বহদ্দারহাট, কাপাসগোলা, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হত।
এ পরিস্থিতিতে নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ ২০১৭ সালে শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এটিসহ চলমান চারটি প্রকল্পের উপর ভর করেই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী মৌসুমে নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “সব সেবা প্রদানকারী সংস্থা সমন্বয় করে আমরা কাজ করেছি। একারণে শতভাগ না হলেও ৫০-৬০ ভাগ আমরা সফল হয়েছি। যে সমন্বয় আছে সেটা ধরে রেখে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
আগামী বছর আমরা চট্টগ্রামবাসীকে শতভাগ জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখতে পারব। শতভাগ আমরা করতে পারব, সেটার জন্য আরো এক দেড় বছর সময় লাগবে। যখন সমস্ত খালগুলো পুরোপুরি সংস্কার করা হয়ে যাবে।
চলতি বছরের উদ্যোগ তুলে ধরে মেয়র বলেন, “সিটি করপোরেশন যেটা করছে, ১৬০০ কিলোমিটার যে নালা আছে সেগুলো পরিষ্কার করার কাজ। কারণ নালাগুলো পরিষ্কার না হলে খালে পানি যাবে না এবং শেষ পর্যন্ত খাল থেকে পানি নদীতে যাবে না।তাই এ কাজটা আমরা করছি। আর বাড়ই পাড়া খাল আছে। সেটাও প্রায় ৯৫ শতাংশ হয়ে গেছে। পাশাপাশি সিডিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। বন্দর কর্ণফুলী নদীতে নিয়মিত খনন করছে এবং কিছু স্থানে নিয়মিত তারা কাজ করছে।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা সার্বিক মনিটরিং করছেন জানিয়ে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “চারজন উপদেষ্টা নিয়মিত আসছেন। এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি একটি খাল পুরো ও অন্য একটি খালের অর্ধেক পরিষ্কার করছে। জামায়াতে ইসলাম একটি খালের অর্ধেক পরিষ্কার করছে। বাকিটা যুবদল করছে। সবাই মিলে একসাথে কাজ করছি।
সবার সমন্বিত উদ্যোগের কারণে চলতি বছর নগরবাসী সুফল পেয়েছে বলে মনে করেন মেয়র।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩৬টি খাল নিয়ে গৃহীত প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। সেটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের জুনে। পরে মেয়াদের সাথে বেড়েছে খরচও।
এখন প্রকল্পের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। আর মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে।
প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ৪৫টি সেতু, ৬টি কালভার্ট, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাপ, পাঁচটি রেগুলেটর নির্মাণ, ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটর নতুন নালা, ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার খালের পাশে সড়ক নির্মাণ ও ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির পূর্ত কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্রিগেড।
প্রকল্প পরিচালক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মো. ফেরদৌস আহমেদ বলেন, “প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৮৪ শতাংশ। ৩৬টি খালের মধ্যে ২৫টি খালের কাজ শতভাগ শেষ।বাকিগুলোর মধ্যে ছয়টি খালের কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। আর পাঁচটি খালের কাজ ৯০ শতাংশের নিচে।
গত কয়েক দিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যেসব খালের কাজ শেষ হয়েছে সেগুলোতে পূর্ণ গতিতে পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
এখনো পর্যন্ত অল্প বৃষ্টি হলে নগরীর আগ্রাবাদ, চকবাজার, এনায়েত বাজার, জিইসি, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ ও মুরাদপুর এলাকায় মূল সড়কে জলাবদ্ধতা হয়। পাশাপাশি নগরীর কয়েকটি এলাকার অলিগলিতে পানি ওঠে।
এরমধ্যে নগরীর কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ ও মুরাদপুর এলাকা হিজড়া খাল ঘিরে। খালটির খনন ও সংস্কার কাজ শেষ হয়নি এখনো।
ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে হিজড়া খালের কার্যক্রমে ধীরগতির কথা তুলে ধরে লেফট্যানেন্ট কর্নেল ফেরদৌস বলেন, “জমি পেলেই ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা সব কাজ শেষ করতে পারব। শুধু হিজড়া খালের জমি অধিগ্রহণ বাকি আছে। সেটার জন্য এখন ঢাকায় অবস্থান করছি।
চট্টগ্রাম অনেক বড় শহর। এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। কয়েকটি জায়গায় এখনো কিছু সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা জানার সাথে সাথে আমরা ব্যবস্থা নিই।
এবারের বন্যা পরিস্থিতি ‘স্বস্তিদায়ক’ দাবি করে পরিবেশবাদী সংগঠন পিপল’স ভয়েসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহম বলেন, “এবারের জলাবদ্ধতা গতবারের তুলনায় কম, সেটা এখন পর্যন্ত নগরবাসীর জন্য স্বস্তির। পুরো বর্ষা মৌসুম এখনো বাকি, তাই এর ধারাবাহিক যেন রক্ষা হয় সেটা সবসময় নজর রাখতে হবে।
এর জন্য নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখার বিষয়ে জোর দিতে হবে এবং বাকি যে কাজগুলো আছে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করতে হবে। কেউ যাতে আবার খাল-নালা দখল করতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর হতে হবে। তা না হলে অবস্থা আগের মতো ভয়ানক হবে।
পরিষ্কার করার পর খালগুলোতে পানি প্রবাহে গতি ফিরেছে।
মূল সড়কের পাশাপাশি নগরীর পাড়া-মহল্লার অলিগলির জলাবদ্ধতা নিরসনেও সেবাসংস্থাগুলোকে মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “গত পাঁচ বছরে খাল-নালায় পড়ে ১৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। জলাবদ্ধতার মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবছরই মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। এ ধরণের ঘটনা যেন আর না ঘটে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
নগরীর কয়েক দশকের পুরোনো জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর মেগা প্রকল্পটিসহ চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোর অধীনে চলমান ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ নামের প্রকল্পটির খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে বিভিন্ন খালের সাথে যুক্ত ২৩টি স্লুইস গেইট থাকছে।
কর্ণফুলী নদীর তীরে বাঁধসহ রাস্তা নির্মাণে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার অন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এতে খালের মুখে ১২টি স্লুইস গেইট নির্মাণ করা হয়েছে ইতিমধ্যে। এরমধ্যে আছে চাক্তাই ও রাজাখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাল।
এছাড়া বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত দুই দশমিক নয় কিলোমিটার দীর্ঘ বাড়ইপাড়া খাল খননে ব্যয় হচ্ছে ১৩৭৪ কোটি টাকা। এই খালটির কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।











