মিয়ানমারে আটক দেশটির সাবেক নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে এনে গৃহবন্দি করা হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ৮০ বছর বয়সী এই নোবেলজয়ীকে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে রাজধানী নেইপিদোর একটি সামরিক কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল।
মিয়ানমারের অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি সু চির বাকি সাজা নির্ধারিত বাসভবনে কাটানোর জন্য ‘আদেশ’ দিয়েছেন। খবর বিবিসির।
মিয়ানমারের তৎকালীন শাসকরা গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রবর্তনের পর ২০১৫ সালে অং সান সু চি ক্ষমতায় আসেন। তার আগে, সামরিক শাসনের কয়েক দশকে তিনি একজন গণতন্ত্রপন্থী কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন এবং আগেও ১৫ বছরেরও বেশি সময় গৃহবন্দি ছিলেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি একটি ছবি সম্প্রচার করেছে যেখানে তাকে ইউনিফর্ম পরা দুজন কর্মীর সঙ্গে বসে থাকতে দেখা গেছে। তবে সু চির ছেলে কিম আরিস এই ঘোষণার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, তার মা জীবিত আছেন এমন কোনো প্রমাণ তার কাছে নেই। তার মতে, প্রচারিত ছবিটি ‘অর্থহীন’; কারণ এটি ২০২২ সালে তোলা হয়েছিল।
কিম আরিস বিবিসিকে বলেন, ‘আমি আশা করি এটি সত্যি। কিন্তু তাকে যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তার কোনো প্রকৃত প্রমাণ আমি এখনো দেখিনি। যতক্ষণ না আমাকে তার সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, অথবা কেউ স্বাধীনভাবে তার অবস্থা ও অবস্থান যাচাই করতে পারছে, ততক্ষণ আমি কিছু বিশ্বাস করব না।’
এই ঘোষণার আগে অং সান সু চির স্বাস্থ্য বা জীবনযাত্রা সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। কিম আরিস গত ডিসেম্বরে জানিয়েছিলেন, বছরের পর বছর ধরে তার মায়ের কাছ থেকে তিনি কোনো খবর পাননি। সুচির আইনি দল রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাকে গৃহবন্দি করার বিষয়ে তাদের সরাসরি কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
পাঁচ বছরেরও বেশি আগে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাকে খুব কমই দেখা গেছে এবং তার সম্পর্কে কিছুই শোনা যায়নি। তার আইনজীবীরা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে দেখেননি। তাঁর পরিবার দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তার সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবারের (৩০ এপ্রিল) আগে সু চির যে ছবিটি দেখা গিয়েছিল, সেটি ছিল ২০২১ সালের মে মাসে একটি আদালত হাজিরা দেওয়ার সময়। সামরিক বাহিনী তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করেছিল; যা বিশ্বজুড়ে সাজানো বা বানোয়াট হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারপর থেকে তার ৩৩ বছরের কারাদণ্ড বেশ কয়েকবার কমিয়ে আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে অং সান সু চির এই আকস্মিক উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামরিক কর্তৃপক্ষ সম্ভবত তার অবস্থার আরও পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে—হয়তো তাকে আংশিক বা সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হতে পারে। দেশটির সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং তার শাসনের কারণে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে উদগ্রীব এবং সশস্ত্র বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে ধারাবাহিক কিছু জয়ের পর তাকে এখন আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে সামরিক জান্তা একটি নির্বাচনও আয়োজন করেছিল, যার মাধ্যমে নামমাত্র একটি গণতান্ত্রিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি সেই একই সামরিক নেতাদের হাতেই রয়ে গেছে।
অং সান সু চির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা শন টার্নেল বিবিসির ‘নিউজডে’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বর্তমানে একটি শক্তিশালী জনসংযোগ বা প্রচারণায় নেমেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এটি একটি বৈধ সরকার এবং অং সান সু চিকে গৃহবন্দি করার খবরটি সেই প্রচেষ্টারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ শন টার্নেল জানান, এই খবরটি সত্য হওয়ার ব্যাপারে তিনি সত্যিই আশাবাদী হলেও তার মনে অনেক সন্দেহ রয়েছে। অস্ট্রেলীয় এই অর্থনীতিবিদ ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের সাথে এক বছরেরও বেশি সময় বন্দি ছিলেন।
শন টার্নেল সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, “তাকে অং সান সু চির সাথে একই কারাগারে রাখা হয়েছিল, যেখানে পরিস্থিতি ছিল ‘মধ্যযুগীয়’ এবং ‘সত্যিই অত্যন্ত ভয়াবহ’। সেখানে খাবার ও চিকিৎসা সেবা ছিল নিম্নমানের এবং কক্ষগুলো ছিল প্রকৃতির প্রতিকূলতার মুখে ‘উন্মুক্ত’। অং সান সু চির বয়স এখন ৮০ বছর হওয়ায় ওই পরিবেশ তার জন্য ছিল ভীষণ কষ্টকর।” এর আগেও বন্দিদশার সময় অং সান সু চির মর্যাদাপূর্ণ ও অহিংস প্রতিরোধ মিয়ানমারসহ সারা বিশ্বের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিল; তিনি তখন তার পারিবারিক বাসভবন থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তবে ২০১৭ সালে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার সেই আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
জনচক্ষুর অন্তরালে বছরের পর বছর কারাবাস সত্ত্বেও, শন টার্নেলের মতে মিয়ানমারের জনগণের কাছে অং সান সু চির মর্যাদা এখনও অত্যন্ত উঁচুতে রয়েছে। শন টার্নেল বলেন, “বর্মি জনগণের সাথে তার এমন এক জাদুকরী ব্যক্তিত্ব ও আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে যা প্রায় আধ্যাত্মিক। আমি মনে করি না যে তাতে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েছে। দেশটির মানুষ কেবল তাকে মুক্ত দেখার আশায় দিন গুনছে।”










