পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে দেশের রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং(আরএসি) খাতে শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য স্বীকৃতির দাবিতে একদিনের কর্মবিরতি,গণ র্যালি আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
শুক্রবার (১মে) সকাল ১১টায় আশুলিয়ার কুটুরিয়া,কাটগড়া এলাকায় বাংলাদেশ আরএসি জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।এতে আরএসি শ্রমজীবী মানুষ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-যন্ত্র ব্যবহারকারী এবং জাতীয়তাবাদী_শ্রমিক_দল আশুলিয়া ইউনিয়নের সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করে গণ র্যালিতে অংশগ্রহণ করেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি বৃহৎ গণ র্যালি অনুষ্ঠিত হয়,যেখানে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অধিকারহীনতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলেন,আরএসি খাত দেশের অর্থনীতি,শিল্প উৎপাদন এবং জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এই খাতের শ্রমজীবী মানুষ এখনো ন্যায্য অধিকার,নিরাপত্তা এবং আইনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।
এ সময় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে “শ্রমিক ঐক্যের ডাক, ইউনিয়ন গঠনে জোরালো দাবি” শীর্ষক আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের আরএসি খাতের শ্রমজীবী মানুষ নানা বঞ্চনা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তারা জানান, প্রতিদিন উচ্চ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ, এসি বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা,গ্যাস লিকেজ এবং ভারী যন্ত্রপাতি বহনের মতো ঝুঁকি মোকাবিলা করেও অধিকাংশ শ্রমিক পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি,চিকিৎসা সহায়তা কিংবা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের অধিকার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও আরএসি খাতের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় এবং সরকারি গেজেটে যথাযথ অন্তর্ভুক্তি না থাকায় এসব সুবিধা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন বা ফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নিলেই হুমকি-ধমকি, মামলা-হামলার ভয়, চাকরি হারানোর আশঙ্কা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে সামাজিকভাবে বিতর্কিত করার মতো নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
বক্তারা বলেন, মালিক সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়ন এক নয়। মালিক সংগঠন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করলেও শ্রমিক ইউনিয়ন কাজ করে শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে। তাই শ্রমিকদের সুরক্ষায় ইউনিয়নের বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংগঠন ছাড়া শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা কঠিন। দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা যায় না, নীতিনির্ধারকদের কাছে শক্ত অবস্থান তৈরি হয় না এবং প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণও বাধাগ্রস্ত হয়।
তারা আরও বলেন, একটি সংগঠিত আরএসি সেক্টর শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, সাধারণ এসি ব্যবহারকারীদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করেন,অনিয়ন্ত্রিত কাজ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় এবং মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহার গ্রাহকদের ক্ষতির কারণ হয়।
১মে দিবস উপলক্ষে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল একদিনের কর্মবিরতি, গণর্যালি, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং শ্রমিক ইউনিয়ন বা ফেডারেশন গঠনের আহ্বান।
শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গেজেটে আরএসি শ্রমিক ইউনিয়ন বা ফেডারেশনকে অন্তর্ভুক্ত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি ও নির্ধারিত বেতন কাঠামো চালু,ঝুঁকি ভাতা প্রদান,দুর্ঘটনায় চিকিৎসা সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ বাধ্যতামূলক করা, শ্রমিক ইউনিয়ন/ফেডারেশন গঠন ও সরকারি স্বীকৃতি প্রদান এবং দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা।
বক্তারা বলেন, সংগঠন ছাড়া নিরাপত্তা নেই, আইনি স্বীকৃতি ছাড়া অধিকার নেই।
তাদের প্রত্যাশা, এবারের আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আরএসি খাতের শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং সরকার, সংশ্লিষ্ট দফতর ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আরএসি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে |











