সর্বশেষ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—স্বস্তির অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ

শফিকুল ইসলাম

বাজারে যাওয়া এখন অনেক পরিবারের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগেও যে অর্থে একটি পরিবারের সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত, এখন সেই অর্থে প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, সবজি, ডিম কিংবা মসলাজাতীয় পণ্য—প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পরও অনেক পরিবারকে নতুন করে খরচের তালিকা সাজাতে হচ্ছে। কেউ পুষ্টিকর খাবার কমাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ সন্তানদের অতিরিক্ত শিক্ষার খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, যখন তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করে এবং মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না, তখন সেটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অনেক পণ্যের দাম কমার পরিবর্তে স্থায়ীভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ডলারের বিনিময় হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বাজারে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব কারণের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতার পরিবেশ এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও।

যখন কোনো পণ্যের উৎপাদন ভালো হয়, তখন সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করেন দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, উৎপাদন বাড়লেও ভোক্তা সেই সুবিধা পান না। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আবার শহরের ভোক্তাকেও বেশি দামে কিনতে হয়। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও অদক্ষতা বা অসংগতি রয়ে গেছে। মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারে তথ্যের অস্বচ্ছতা—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির অভিযোগও নতুন নয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যদি অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেন, তবে তার প্রভাব পড়ে লাখো সাধারণ মানুষের ওপর। তাই বাজার তদারকি শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অনিয়মের সুযোগই কমে আসে। নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। উচ্চ আয়ের মানুষ কিছুটা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারলেও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতিদিনই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একসময় যে পরিবার সপ্তাহে কয়েক দিন মাছ বা মাংস কিনতে পারত, তারা এখন মাসে এক-দুইবার সেই সুযোগ পাচ্ছে। শিশুদের পুষ্টি, বয়স্কদের চিকিৎসা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সামাজিক প্রভাবও গভীর হতে পারে।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য—উৎপাদন বাড়লেও লাভ কার?

সরকার বিভিন্ন সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি, আমদানি সহজীকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেলেও, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো—বাজারে সেই প্রভাব আরও দৃশ্যমান হোক। কারণ কোনো নীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত পরিমাপ করা হয় নাগরিকের অভিজ্ঞতায়। মানুষ যদি বাজারে গিয়ে স্বস্তি অনুভব না করেন, তবে নীতিগত উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

কৃষি খাতের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া সময়ের দাবি। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি দেশের কৃষক। তারা যদি উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য না পান, তবে ভবিষ্যতে উৎপাদনে আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার ভোক্তাও যদি অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হন, তবে সেটিও অর্থনীতির জন্য শুভ সংকেত নয়। তাই উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে এমন বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে বাজার ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো যেতে পারে। কোথায় কোন পণ্যের কত মজুত রয়েছে, কোথায় উৎপাদন কম বা বেশি, কোন অঞ্চলে সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে—এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিলে বাজারে অস্থিরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে তথ্যের সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সীমিত আয়ের পরিবারগুলো যেন সহজে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পেতে পারে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।

অর্থনীতির ভাষায় বাজার সবসময় চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে বাজার মানে মানুষের জীবনযাত্রা। একজন দিনমজুরের জন্য চালের দাম বাড়া মানে হয়তো একবেলা খাবার কমে যাওয়া। একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর জন্য ডিম বা দুধের দাম বৃদ্ধি মানে সন্তানের পুষ্টিতে আপস করা। তাই দ্রব্যমূল্যের প্রশ্নকে কেবল অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

তরুণ সমাজ ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি—চাকরি খোঁজা থেকে চাকরি সৃষ্টির পথে

বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও এগিয়ে চলেছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা, কার্যকর বাজার তদারকি, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, কৃষকের প্রণোদনা এবং ভোক্তার স্বার্থ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে সাময়িক সংকট বারবার বড় সমস্যায় রূপ না নেয়।

সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা শুধু এমন একটি বাজার চায়, যেখানে মাসের আয় দিয়ে সম্মানের সঙ্গে সংসার চালানো যায়। যেখানে প্রতিদিন বাজারে গিয়ে নতুন দামের ধাক্কা খেতে না হয়। যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে আশার জায়গা বড় হয়।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা নিঃসন্দেহে একটি জটিল কাজ। তবে জটিলতার অজুহাতে সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করা কোনো সমাধান নয়। কার্যকর নীতি, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কারণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য তখনই উপলব্ধি করা যাবে, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।

ADVERTISEMENT

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত


সম্পাদক ও প্রকাশক : মাে:শফিকুল ইসলাম

কার্যালয় : ভাদাইল, ডিইপিজেড রোড, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা-১৩৪৯

যোগাযোগ: +৮৮০ ১৯১ ১৬৩ ০৮১০
ই-মেইল : dailyamaderkhobor2018@gmail.com

দৈনিক আমাদের খবর বাংলাদেশের একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে দৈনিক আমাদের খবর, অনলাইন নিউজ পোর্টালটি সব ধরনের খবর প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচারিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলির মধ্যে এটি একটি।

ADVERTISEMENT
×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
০৩ আগস্ট ২০২৬
Trulli

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—স্বস্তির অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ