সর্বশেষ

স্বাস্থ্যসেবার মান—জেলা থেকে রাজধানী, সবার জন্য কি সমান চিকিৎসা নিশ্চিত?

মোঃ মাইনুল ইসলাম

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক তার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সাধারণ মানুষ সময়মতো মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পান। সুস্থ নাগরিকই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এখনও রাজধানী ও জেলার মধ্যে দৃশ্যমান বৈষম্য রয়ে গেছে। এই বৈষম্য দূর করা এখন শুধু স্বাস্থ্য খাতের নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হাজার হাজার রোগী আসেন। অনেকে রাতভর বাসে বা লঞ্চে যাত্রা করে চিকিৎসার আশায় রাজধানীতে পৌঁছান। কারণ তাদের বিশ্বাস, জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসা জেলা শহরে পাওয়া সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা একদিকে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে জেলার মানুষকে চিকিৎসা পেতে বাড়তি অর্থ, সময় এবং দুর্ভোগের মুখোমুখি করছে।

স্বাস্থ্যসেবায় এই কেন্দ্রীকরণের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল নেই, আবার কোথাও চিকিৎসক সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং ওষুধ সরবরাহের অনিয়মও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়।গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে রোগের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা নয়, জরুরি সেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ব্যবস্থাপনায়ও আরও দক্ষতা ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং কিডনি রোগের সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। অনেক জেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ না থাকায় রোগীদের রাজধানীমুখী হতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায় এবং দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।

স্বাস্থ্য খাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, শহরে চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পদ শূন্য থাকে। এই বৈষম্য দূর করতে কার্যকর নীতি গ্রহণ জরুরি।ডিজিটাল প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। টেলিমেডিসিন, অনলাইন পরামর্শ, ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং দূরবর্তী রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক সেবা এখন জেলা পর্যায়েই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত এবং কার্যকর করতে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জবাবদিহিতার বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান, ওষুধের প্রাপ্যতা, রোগীর সঙ্গে আচরণ এবং সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত। একইভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সেবার মান, ব্যয় এবং নীতিমালা অনুসরণের বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা একটি ব্যবসা হতে পারে, কিন্তু এটি সর্বোপরি একটি জনসেবাও।

সাংবাদিকতার অন্তরালে – সত্য বনাম স্বার্থের দ্বৈরথ

চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক পরিবার একজন সদস্যের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয় কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। স্বাস্থ্যসেবা যেন কোনো পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ না হয়, সে লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিমা বা অন্যান্য আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে।জনস্বাস্থ্য শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, স্যানিটেশন, টিকাদান এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অনেক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপও কমাবে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নতুন মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সুবিধাগুলো যেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে পান। কারণ একজন রোগীর ঠিকানা নয়, তার চিকিৎসার প্রয়োজনই হওয়া উচিত সেবা পাওয়ার প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু উন্নত ভবন বা আধুনিক যন্ত্রপাতিতে নয়; বরং সংকটের সময় একজন সাধারণ নাগরিক কত দ্রুত এবং কত মানসম্মত চিকিৎসা পাচ্ছেন, তার ওপরও নির্ভর করে। রাজধানীর মতো জেলার একজন রোগীও যদি সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং ওষুধ পান, তবেই স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে।বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়। দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকর পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং সর্বোপরি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে চিকিৎসার মান নির্ধারিত হবে না রোগীর বসবাসের স্থান দিয়ে।স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করতে হলে রাজধানী ও জেলার ব্যবধান কমিয়ে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ সমান আস্থা নিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। সেটিই হবে একটি সুস্থ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।

মোঃ মাইনুল ইসলাম
নির্বাহী সম্পাদক
দৈনিক আমাদের খবর

জ্বালানি সাশ্রয়—শুধু সংকটের সময় নয়, অভ্যাসেও আনতে হবে

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

দৈনিক আমাদের খবর একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নির্ভুলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
০২ আগস্ট ২০২৬
Trulli

স্বাস্থ্যসেবার মান—জেলা থেকে রাজধানী, সবার জন্য কি সমান চিকিৎসা নিশ্চিত?