বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই তরুণ, যারা মেধা, উদ্যম ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ। এই তরুণরাই আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করলেও সবার জন্য কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অপেক্ষা, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা অনেক তরুণের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা নিয়ে এগোচ্ছি, নাকি চাকরি সৃষ্টি করার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে পারছি?
বিশ্বের অর্থনীতিতে গত দুই দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়াকেই সফলতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বহু পরিচিত প্রতিষ্ঠানই একসময় ছোট উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। আজ তারা শুধু নিজেদের সাফল্যের গল্প লেখেনি, বরং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
গত কয়েক বছরে দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, অনলাইন সেবা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, ফুড প্রসেসিং, ফ্রিল্যান্সিং, হস্তশিল্প এবং সৃজনশীল শিল্পে নতুন উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অনেক তরুণ সীমিত মূলধন নিয়েই নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করেছেন। কেউ অনলাইনে ব্যবসা করছেন, কেউ প্রযুক্তি সেবা দিচ্ছেন, আবার কেউ স্থানীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণরা শুধু চাকরি খুঁজতেই নয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতেও সক্ষম।
তবে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ নয়। ব্যবসা শুরু করতে মূলধনের সংকট, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং অভিজ্ঞতার অভাব—এসব কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। আবার অনেক তরুণ পরিবার ও সমাজের মানসিক সমর্থনও পান না। এখনও অনেক পরিবার মনে করে, সরকারি বা বেসরকারি চাকরিই সবচেয়ে নিরাপদ পেশা। ফলে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন অনেক সময় সামাজিক চাপের কাছে হার মেনে যায়।
শিক্ষাব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একজন উদ্যোক্তার জন্য প্রয়োজন সমস্যা চিহ্নিত করার দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, নেতৃত্ব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এসব বিষয়কে শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ করা গেলে নতুন প্রজন্ম আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগোতে পারবে।
প্রযুক্তি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এখন একটি ভালো ধারণা, একটি ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েই অনেক ধরনের ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও দেশজুড়ে এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
সরকারি নীতিতেও উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। নতুন ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ করা, স্টার্টআপে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ বৃদ্ধি, কর-সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানো গেলে অনেক তরুণ ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা সমান সুযোগ পান।
বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও আরও কার্যকর সমন্বয় দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন সেন্টার, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর, গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ বাড়ানো গেলে নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। গবেষণাগারে জন্ম নেওয়া একটি ধারণাও ভবিষ্যতে বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে—যদি সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পাওয়া যায়।
তবে উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট নয়; ব্যর্থতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। ব্যবসায় প্রথমবার ব্যর্থ হওয়া মানেই সব শেষ নয়। বিশ্বের অনেক সফল উদ্যোক্তাই একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাদের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। আমাদের সমাজেও ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও উদ্যোক্তা তৈরির বিশাল সুযোগ রয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পর্যটন, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় পণ্যভিত্তিক ব্যবসায় বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তরুণদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া যায়, তাহলে শুধু শহর নয়, গ্রামেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাড়ে। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি শুধু সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাই একটি দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখেন। তাই তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ানো মানে ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তির প্রসার, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
চাকরি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়ন তখনই গতি পায়, যখন কিছু মানুষ শুধু চাকরি খোঁজেন না, বরং অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করেন। তাই সময় এসেছে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, সম্ভাব্য উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে দেখার।
বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়ন নির্ভর করবে আজকের তরুণদের সিদ্ধান্তের ওপর। তারা যদি নতুন ধারণা, প্রযুক্তি ও সাহস নিয়ে এগিয়ে আসেন, আর রাষ্ট্র ও সমাজ যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে উদ্যোক্তা সংস্কৃতি শুধু অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না; একটি আত্মনির্ভর, উদ্ভাবনী ও কর্মমুখী বাংলাদেশ গড়ার পথও আরও সুগম হবে।
মোঃ রাকিবুল হাসান
বার্তা সম্পাদক
দৈনিক আমাদের খবর
















