সর্বশেষ

শিক্ষিত বেকারত্ব—ডিগ্রি বাড়ছে, কর্মসংস্থান কি বাড়ছে?

শফিকুল ইসলাম

প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেন। তাদের প্রত্যেকেরই একটি স্বপ্ন থাকে—নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী একটি সম্মানজনক চাকরি, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। কিন্তু বাস্তবতা অনেকের জন্যই ভিন্ন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর মাসের পর মাস, কখনো কখনো বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে অসংখ্য তরুণকে। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব আজ শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এটিই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে তা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকাই যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে ব্যক্তি, পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর।

 

শিক্ষিত বেকারত্বের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত, আর বেসরকারি খাতেও সব ক্ষেত্রে সমান গতিতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ফলে অল্পসংখ্যক পদের জন্য হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ছে। একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকশ পদ থাকলেও আবেদনকারীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাওয়া এখন আর অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

 

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে এখনও একটি দৃশ্যমান দূরত্ব রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান না। আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি।

আজকের চাকরির বাজারে শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়। একজন চাকরিপ্রার্থীকে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতাও দেখাতে হয়। অথচ এসব বিষয়ে অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি পান না। ফলে ডিগ্রি থাকলেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য—উৎপাদন বাড়লেও লাভ কার?

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাকরি সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখনও সমাজের একটি বড় অংশ সরকারি চাকরিকেই সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক মনে করে। এতে অনেক তরুণ বছরের পর বছর শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অন্য সম্ভাবনাগুলো এড়িয়ে যান। অথচ বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা হওয়া, ফ্রিল্যান্সিং, প্রযুক্তিভিত্তিক পেশা কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোগ—এসব ক্ষেত্রেও আজ ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কর্মসংস্থানের ধারণাকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সময় এসেছে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিকশিত হলেও এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সহজে ঋণ পাওয়া, ব্যবসা শুরু করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ—এসব ক্ষেত্রে আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেন না; অন্যদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন।

 

বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিও শিক্ষিত বেকারত্ব কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সেবা খাত এবং উৎপাদনমুখী শিল্প গড়ে ওঠে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং দক্ষ জনশক্তির চাহিদাও তৈরি হয়। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দক্ষতা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করা সময়ের দাবি।

চাকরি খোঁজার পাশাপাশি চাকরি তৈরির মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন, গবেষণা এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা গেলে অনেক তরুণ নিজেই নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবেন। এতে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।

তরুণ সমাজ ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি—চাকরি খোঁজা থেকে চাকরি সৃষ্টির পথে

 

শিক্ষিত বেকারত্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার কারণে অনেক তরুণ হতাশায় ভোগেন, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং মানসিক চাপে পড়েন। পরিবারেও এর প্রভাব পড়ে। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন বহু বছর পড়াশোনা শেষ করেও কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন না, তখন তা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং সামগ্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।

এই সমস্যা সমাধানে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং বেসরকারি সংগঠন—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষাকে কর্মমুখী করা, শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং কর্মশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু যদি শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকে, তবে সেই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

ডিগ্রি একজন মানুষের যোগ্যতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু সেই যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করাই একটি রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। কর্মসংস্থান শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশার ভিত্তি। তাই শিক্ষিত বেকারত্ব কমানোকে শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার শিক্ষিত তরুণদের সনদে নয়, সেই সনদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।

ADVERTISEMENT

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত


সম্পাদক ও প্রকাশক : মাে:শফিকুল ইসলাম

কার্যালয় : ভাদাইল, ডিইপিজেড রোড, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা-১৩৪৯

যোগাযোগ: +৮৮০ ১৯১ ১৬৩ ০৮১০
ই-মেইল : dailyamaderkhobor2018@gmail.com

দৈনিক আমাদের খবর বাংলাদেশের একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে দৈনিক আমাদের খবর, অনলাইন নিউজ পোর্টালটি সব ধরনের খবর প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচারিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলির মধ্যে এটি একটি।

ADVERTISEMENT
×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
০৩ আগস্ট ২০২৬
Trulli

শিক্ষিত বেকারত্ব—ডিগ্রি বাড়ছে, কর্মসংস্থান কি বাড়ছে?